জহির রায়হান ফিরে আসছেন

5

সকালবেলায়ই জামিলুর রহমান চেঁচামেচি শুরু করলেন। তিনি আর উত্তেজনা চেপে রাখতে পারলেন না। ‘জহির রায়হান ফিরে আসছেন।’ কথাটা শোনা মাত্র আমার সম্বিত ভাঙলো।

এতোক্ষণ আমি গতকাল ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক কয়েকটা ঘটনা নিয়ে ভাবছিলাম। ঘটনাগুলো ছোট, কিন্তু সংকেতপ্রদায়ী।

যা হোক, জহির রায়হান ফিরে আসছেন মানে? কি ব্যাপার? আমার জানালা দিয়ে উঁকি দিলেই জামিল সাহেবের ঘরের ভেতরটা দেখা যায়। তাই আমার ঘরের এ জানালায় সারাক্ষণ পর্দা টানা থাকে। আমি জানালার সামনে এসে দাঁড়ালাম। পর্দা সরিয়ে দেখি জামিল সাহেব ঘরের ভেতর অস্থির পায়চারী করছেন। হাতে একটা নিউজপেপার ধরা। তার স্ত্রী সোফার ওপাশে দাঁড়ানো। বাচ্চা দু’টো বোধহয় স্কুলে।

— কি খবর জামিল সাহেব?
আমি উপর থেকে তাকিয়ে আছি দেখে, যেন জামিলুর রহমান চমকে গেলেন। আরে চমকে গেলে চলবে না, আপনি যে শাহবাগ যান তা আমি জানি–এমনটা বলতে ইচ্ছে হলো একবার, কিন্তু বললাম না। জামিল সাহেব বোধহয় জানেন না যে আমিও শাহবাগ যাই। আরও জানেন না যে উনি যান তা আমি জানি।

— না, না। কিছু না। কেমন আছেন?
— আমি ভালো আছি। আপনার কি খবর?
— আজ অফিসে যাইনি, ছুটি নিয়েছি।
চট করে আমার মনে পড়লো। আজ ৫ ফেব্রুয়ারি। শাহবাগ গণজাগরণ দিবস। শাহবাগ গণজাগরণের বর্ষপূর্তি।
আমি মৃদু হাসলাম।
— কেন? শরীর ভালো নয়?
— ওরকমই আরকি! সিরিয়াস কিছু নয়।
— বাইরে আসেন।
— আচ্ছা।
আমি ঘরটায় তালা দিয়ে, নেমে এলাম। জামিলুর রহমানও এলেন।
— চলুন, চা খেয়ে আসি।
জামিলুর রহমান ঘড়ি দেখলেন।
— চলুন, তবে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে।
আমি সম্মতি জ্ঞাপন করে মাথা নাড়লাম ।

দু’জনে চা খেলাম। এসব চায়ের দোকানে আসতে জামিলুর রহমান বরাবর সঙ্কোচ বোধ করেন। সঙ্কোচ এখন আরো বেশি হয় এবং কেন আমি তা জানি। এখন এসব চায়ের দোকানে গণজাগরণ মঞ্চ নিয়ে বেশি সমালোচনা হয়, জামিল সাহেব তা সহ্য করতে পারেন না–আমি বুঝতে পারি।

দু’জনে দু’টো ক্যাপস্টান ধরাই। সিগারেট শেয়ার করা অনেক বছর হলো বন্ধ করেছি। রাস্তার একপাশে একটা গাছের ছায়া-তার নিচে দাঁড়াই, সিগারেট ফুঁকি।
আমি জানতে চাই : আজ কোথাও যাবেন?
— না তেমন বিশেষ কিছু না।
— চলেন আজ বিকেলে সিনেমায় যাই। জহির রায়হান রেট্রোস্পেকটিভ চলছে মাল্টিপ্লেক্সে।
জামিলুর রহমানের চোখে শঙ্কা।
— না না, ওখানে গিয়ে আমি কি করবো!
— কেন আপনিই তো বলছেন জহির রায়হান ফিরে আসছেন। শুনুন আমিও কিন্তু শাহবাগে যাই। আপনাকে আমি কয়েকবার দেখেছি।
আঁতকে উঠলেন জামিলুর রহমান।
— ভাই, বাড়ির লোকে যেন জানে না…
— আপনার ব্লগ একাউন্ট আছে?
— না, তবে খুলবো।
— কেন?
— এদের পরাজিত করতে হলে বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনও দরকার। ধর্ম-দর্শন-বিজ্ঞান এসব নিয়ে তুলনামূলক লেখা প্রচার খুব দরকার।
— কিন্তু শাহবাগে যে যান, মিছিলে হাত তোলেন তা কেন জানাতে চান না।
— বৌ-বাচ্চা আছে, তার ওপর সরকারী চাকরী করি। সরকার পরিবর্তন হলে খাড়া ঝুলবে। যা করতে হবে সাবধানে।
— কিন্তু বিপ্লবীরা এতো ভীতু হলে চলে না!
— না-এটা কৌশলও বলতে পারেন। যুদ্ধে যে কোনো কৌশল নেয়া যায়, জিতলেই হলো।
— আচ্ছা, জহির রায়হানের ব্যাপারটি কি বলেন তো?
— ও কিছু না। জহির রায়হান অন্তর্ধান থেকে ফিরছেন।
— মানে?
— হ্যাঁ।
— তিনি কি ফিরে এসেছেন? অনেক বয়স নিশ্চয়ই।
— না-তিনি ফিরবেন।
— আপনি শুনলেন কোথায়?
— আমার সঙ্গে তার কথা হয়েছে।
জামিলুর রহমানের দিকে তাকালাম। কি ব্যাপার! লোকটার কোনো সমস্যা নেই তো? চোখ একটু লাল অবশ্য। ও তেমন কিছু নয় হয়তো।
— কি কথা হয়েছে?
— তিনি ফিরে আসবেন…
— কবে?
— খুব শীঘ্র ফিরবেন। হয়তো আজই…
— আপনার সঙ্গে কিভাবে কথা হয়েছে? আপনি কি ওনার কাছে গিয়েছিলেন? নাকি ফোনে কথা হয়েছে?

আমার প্রশ্ন শুনে উনি হো হো করে হাসলেন। কোনো উত্তর দিলেন না। আমি চোখ সরু করে তার চলে যাওয়া দেখলাম। কাহিনীটা কি? জহির রায়হান এতো বছর পর ফিরবেন? উদ্ভট তো!

২.
সেদিন গভীর রাতে নিদ্রামগ্ন সকলে এক গম্ভীর ও সুউচ্চ ঘোষণায় সকলের ঘুম ভেঙে গেলো। আশেপাশের বাড়ির সকলে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দেখলেন, মহল্লার তিনতলা বাড়ির ছাদে শীর্ণকায় এক ব্যক্তি এসে দাঁড়িয়েছেন, তিনি বলছেন—

‘‘আমি জহির রায়হান বলছি…’’

সকলে চমকে গেলো, এ কি! সত্যি সত্যি কি ইনি জহির রায়হান? তাও বা হয় কি করে? তিনি যদি সশরীরে জীবিত থাকতেন তাহলে তার বয়স হতো অনেক, ১৯৩৫ এ জহির রায়হানের জন্ম, তাহলে তো ৮০ বছরের এক বৃদ্ধ এসে বলতেন হয়তো ‘আমিই জহির রায়হান’, কিন্তু যে লোক বলছেন ওই তিনতলা বাড়ির ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি তো যুবা, অবিকল পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ বছরের জহির রায়হান।

পরদিন সকাল থেকে জামিলুর সাহেবের আর কোনো খোঁজ পাওয়া গেলো না, কেন তা অবশ্য আমি জানি না। আমি শুধু খবরের কাগজটাতে পড়ছিলাম : নির্মাতা ও চলচ্চিত্র গবেষক নুরুল আলম আতিক কোনো একটি আসরে জহির রায়হানকে নিয়ে একটি লেখা বক্তৃতা আকারে উপস্থাপন করেছেন, ওই লেখার শিরোনাম ‘জহির রায়হানের খোঁজ পাওয়া গেছে’, সে কথা ওই খবরের কাগজে লেখা ছিলো। আসলে ব্যক্তি জহির রায়হানকে পাওয়া যায়নি, এ দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে তার চলচ্চিত্র মানসের কথা বলা হয়েছে।

আমার কাছে পুরো ব্যাপারটি ধাঁধা মনে হলো। কিছুই মেলাতে পারলাম না। কিন্তু জহির রায়হানের মতো জামিলুর রহমানের অন্তর্ধানও একটি প্রতীক হয়ে রইলো আমার কাছে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s