ঘাতকের সঙ্গে বসবাস

575161_432033246859187_774821968_n

তরুণ প্রজন্মের বিশ্বাস ভাঙা কঠিন। আমেরিকা প্রবাসী লেখক অভিজিৎ রায় বেঁচে থাকতে আমার এক তরুণ লেখকবন্ধু তাকে কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন:’দাদা, আমরা আছি। বাংলাদেশ এখনো বাংলাস্তান হয়নি।’ সেদিন হয়তো তিনি মৃদু হেসেছিলেন তারুণ্যের উত্তাপ দেখে। কিন্তু এ বছর ফেব্রুয়ারিতে যেদিন অভিজিৎ রায় ঢাকা একুশে বইমেলা থেকে বাসায় ফেরার পথে খুন হন সেদিন আমার সেই লেখকবন্ধু বারবার বলছিলেন:’হ্যাঁ, দাদা, বাংলাস্তান থেকে বলছি। আমিই ভুল ছিলাম।’ ‘মুক্তমনা’ ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বাংলাদেশী পদার্থবিজ্ঞানী অজয় রায়ের পুত্র। অভিজিৎ রায় ছিলেন সমালোচক, সমকামী অধিকার আদায়ের কর্মী, ছিলেন পেশায় প্রকৌশলী ও মিশ্র বিয়ের সমর্থক। তার লেখা বইগুলো হলো:’আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী’ (২০০৫), ‘মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে’ (২০০৭), ‘স্বতন্ত্র ভাবনা:মুক্তচিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি’ (২০০৮), ‘সমকামিতা:বৈজ্ঞানিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অনুসন্ধান’ (২০১০), ‘অবিশ্বাসের দর্শন’ (২০১১), ‘বিশ্বাস ও বিজ্ঞান’ (২০১২), ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব (২০১৪), ‘ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো:এক রবি-বিদেশিনীর খোঁজে’ (২০১৫)। এসব বইয়ে তিনি প্রথাবিরোধিতা, মুক্তচিন্তা, নাস্তিক্যবাদ, সমকাম, ধর্ম নিয়ে অবিশ্বাস, বিজ্ঞান ভাবনা নিয়ে লিখেছেন।

লিটলম্যাগ সম্পাদক, লেখক অনন্ত বিজয় দাশের বইগুলোর নাম হলো:’সোভিয়েত ইউনিয়নে বিজ্ঞান ও বিপ্লব’, ‘ডারউইন: একুশ শতকে প্রাসঙ্গিকতা এবং ভাবনা’।
অনন্ত বিজয় দাশ খুন হন দিনের আলোয়, রাস্তায়। সিলেট থেকে অনন্ত বিজয় দাশের ‘যুক্তি’ লিটল ম্যাগাজিনটি দুইটি সংখ্যা ডাকে পেয়েছিলাম। বিনিময়ে আমার পত্রিকাও পাঠিয়েছিলাম। পত্রিকাটি ছিল যুক্তিবাদ নিয়ে, কুসংস্কারের বিপক্ষে। প্রবন্ধের পত্রিকা। লিটলম্যাগ। মানুষকে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের আলোয় দীপিত করা ছিল লক্ষ্য। তার প্রতিটি সংখ্যায়ে যে লেখাপত্র থাকতো তাতে এমন কোন লেখা ছিলো না যে তাকে অফিসে যাবার রাস্তায় কুপিয়ে মারতে হবে। এটা এ বছরেরই এপ্রিলের কথা। এর আগেই বেশ কয়েকজন ব্লগারের প্রাণ ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদীদের চাপাতি কেড়ে নিয়েছিল। তাই অনন্ত বিজয় দাশ চেয়েছিলেন জীবনের তাগিদে দূর দেশে পাড়ি জমাতে, যেখানে বেঁচে থেকে লিখে যেতে পারবেন মানুষকে যা কিছু শাসন করে তার বিপক্ষে। একবার তার ভিসার আবেদন বাতিল হয়েছিল। পরেরবার একটি বিদেশী সংস্থায় নির্যাতিত লেখক হিসেবে সহযোগিতার আহব্বান জানিয়েছিলেন। তারা সাড়াও দিয়েছিল, অপেক্ষা করছিলেন কাছের স্বজন চাকরীর নিশ্চয়তা ছেড়ে দূরে চলে যাবার। ওদিকে Swedish PEN তাকে বাক স্বাধীনতার ওপরে একটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেয়ার আহ্বান জানায়। কিন্তু ঢাকাস্থ ভিসা অফিস তাকে স্মরণ করে দেয় তার ভিসার আবেদন প্রথমবার বাতিল হয়েছিল, এবং তার এখনকার এই যাত্রা এ মুহূর্তে খুব জরুরী কিছু নয়। এরপরই ঘটে তাকে হত্যার ঘটনা। Swedish PEN শোক প্রকাশ করে। অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ড ঘটে রাতের অন্ধকারে, আর অনন্ত বিজয় হত্যাকাণ্ড ঘটে দিনের আলোয় ও মুখোশ পরা খুনীরা পালিয়ে যায়।

অনন্ত বিজয় দাশ যেভাবে দিনগুলো কাটিয়েছিলেন, আজ সেরকম দিন কাটাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রতিটি তরুণ মুক্তচিন্তক লেখক-প্রকাশক-সম্পাদক-ব্লগার। পথ চলতে হয় দেখেশুনে, কেউ অনুসরণ করছে কিনা, বারবার থাকার জায়গা বদল, কাউকে ঠিকানা না দেয়া, মৃত্যুভয়ের বাতাবরণের মাঝে। কেউ কেউ কোন না কোন ভাবে বিদেশে চলে গেছেন। আমার জন্মভূমিতে আমি নিরাপদ নেই, এই লজ্জা নিয়ে শরণার্থী হিসেবে নির্যাতিত লেখক হিসেবে বিদেশী দূতাবাসগুলোতে, বাক প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সহায়তার আহ্বান জানাচ্ছেন। গত তিন বছরে বাংলাদেশে এগারোজন লেখক-ব্লগার-প্রকাশক-অনলাইন একটিভিস্টকে হত্যা করা হয়েছে: জাফর মুন্সী (১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩), রাজীব হায়দার (১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩), মামুন হোসেন (২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩), জগৎজ্যোতি তালুকদার (২ মার্চ ২০১৩), আরিফ রায়হান দ্বীপ (৯ এপ্রিল ২০১৩), জিয়াউদ্দিন জাকারিয়া বাবু (৯ ডিসেম্বর ২০১৩), এসএম আশরাফুল আলম সুজন (১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৪), অভিজিৎ রায় (২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫), ওয়াশিকুর রহমান বাবু (২৯ মার্চ ২০১৫), অনন্ত বিজয় দাশ (১২ মে ২০১৫), নিলয় চট্টোপাধ্যায় (৭ আগস্ট ২০১৫), আরেফিন ফয়সাল দীপন (৩১ অক্টোবর ২০১৫)। এছাড়া আসিফ মহিউদ্দিনকে হত্যাচেষ্টা হয় (১৪ জানুয়ারি ২০১৩) ও এসব ঘটনায় ব্লগার লেখক প্রকাশকদের সঙ্গীরাও গুরুতর আহত হন। এছাড়া আরো কয়েকজন ধর্মীয় চিন্তার ভিন্ন মতাদর্শী মানুষ খুন হয়েছেন। যেমন: মাজার-পীরপন্থী নেতা, ইসলামী অনুষ্ঠানের উপস্থাপক। এ বছরে ইতালি ও জাপানের দু’জন নাগরিককে হত্যা করা হয় এবং জঙ্গী সংগঠন থেকে দায় স্বীকার করা হয়।
এতোদিন এসব খুব বেশি প্রভাব ফেলেনি আমাদের তথাকথিত লেখক সমাজের মাঝে। আত্মবিক্রিত বুদ্ধিজীবীরা বাক স্বাধীনতার প্রতীক শহীদ মিনারে আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় ব্লগারদের স্বাধীনতার সীমা লঙ্ঘন না করার জন্য বক্তৃতা করেছে। RAB এর মতো এলিট আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, যারা সব রকমের সন্ত্রাসবাদ দমনের জন্য গঠিত হয়েছিল, যাদের বিরুদ্ধে বিচার বহির্ভূত হত্যা ও রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত হত্যার অসংখ্য অভিযোগ আছে, তাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ব্লগার-লেখকদের লেখালেখির ওপর নজরদারি করতে। আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা, যা তৈরি করা হয়েছিল মোল্লাদের দাবির মুখে ব্লাসফেমি আইন এর বিকল্প হিসেবে, সে আইনের ধারার অধীনে বিকল্প গণমাধ্যম হিসেবে পরিচিত সামাজিক গণমাধ্যমে ধর্মের কথিত সমালোচনা করায় অনেকে গ্রেফতার ও নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন। পদকলোভী সাহিত্যিকরা সরকারী লুটের টাকা ভাগবাটোয়ারায় ব্যস্ত। গত ৩১ অক্টোবর একই সময়ে ঢাকায় জঙ্গীদের দু’টি আক্রমণে ‘জাগৃতি’ প্রকাশনীর কর্ণধার আরেফিন ফয়সাল দীপন নিহত ও অন্য তিন কবি-লেখক ও প্রকাশকের ওপর রক্তক্ষয়ী হামলা হলে সবাই এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। এখন লেখকেরা বুঝতে পারছেন এদেশে কেউ আর নিরাপদ নন। যারা লিখছেন, যারা প্রকাশ করছেন তারাই এখন এদেশে বড় অপরাধী। এসব ঘটনায় রাষ্ট্র নির্বিকার ও নিস্ক্রিয় থেকে মানবিকতা, সমাজ নামক অলিখিত প্রতিষ্ঠানটিকে, মানুষের নাগরিক বোধগুলো রীতিমত মুছে দিয়ে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার আগুনে ফুঁ দিচ্ছে। যারা এসবের প্রতিবাদে লিখছেন, প্রকাশ করছেন তারাও নতুন করে হত্যার হুমকি পাচ্ছেন। জঙ্গীদের হিটলিস্টের বাইরে থাকা লেখক প্রকাশক যেহেতু আবারও খুন হয়েছেন তাই সব লেখকেরা আজ স্বাধীন দেশে পরাধীনতার স্বাদ নিচ্ছেন। স্বাধীনতা লাভের ঠিক দু’দিন আগে বিজয়ের পূর্বমুহূর্তে ১৯৭১ এর ১৪ ডিসেম্বরের পরিকল্পিত বুদ্ধিজীবী হত্যা থেকে বাংলাদেশ আসলে কখনোই বের হয়ে আসতে পারেনি।

ব্লগার মানেই নাস্তিক, ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করে এমন মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে একরকম সমর্থন তৈরি করা হয়েছে, ব্লগার-লেখকেরা ধর্মবিরোধী এই আখ্যা দিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের মাঝে এসব হত্যার নিরব সমর্থক তৈরি করা হয়েছে। তার সংখ্যা কতো আমরা জানি না। আমরা শুধু জানি সরকারী নিয়ন্ত্রণহীন পনেরো হাজার কওমি মাদ্রাসায় চৌদ্দ লক্ষের বেশি ছাত্র আছে যারা বিদ্বেষপূর্ণ উগ্র মনোভাব নিয়ে বেড়ে উঠছে। আমরা জানি বিভিন্ন জঙ্গিতৎপরতায় পাঁচশ’র বেশি আটক সন্ত্রাসবাদীরা জামিন নিয়ে রাষ্ট্রের ঔদাসিন্যের সুযোগে বেরিয়ে গেছে এবং আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধারা বলেছেন:’১৯৭১-এ আমরা ভীত ছিলাম না, কিন্তু আজ বাংলাদেশের পরিণতি নিয়ে ভয় হয়। তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে ভয় হয়, যেখানে রাজনীতি পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে শ্বাপদদের–ওরা পারবে তো অন্ধকারের দানব আর তাদের লেলিয়ে দেয়া হায়েনাদের বিপক্ষে? কেননা ওদের হাতে তো অস্ত্র নেই, শুধু কলম। ওরা কি পারবে অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী হতে?’ হ্যাঁ, কলম চলবে; সব অন্ধকার ও কুসংস্কারের বিপক্ষে–প্রথার বিপক্ষে-বিশ্বাসের ভাইরাসের বিপক্ষে। কলম চলবে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s