নবনীতা বৃন্দা’র সাইকেল ও বাংলাদেশি লেখকদের পুরুস্কার প্রত্যাখ্যানের স্বাধীনতা

download (6)

আসলে আমাদের বাক স্বাধীনতা তো দূরের কথা কখনও প্রত্যাখ্যানের স্বাধীনতাও ছিলো না।

পাশ্ববর্তী ভারতে গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকজন যুক্তিবাদী লেখক হত্যার স্বীকার হয়েছেন; তারা হলেন এমএম কালবুর্গি, নরেন্দ্র ডাবেলকার, গোবিন্দ পানসার। গো-হত্যা, গো-চুরি, গো-মাংস খাওয়া এবং মন্দিরে দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ প্রবেশ করা নিয়ে সংখ্যালঘু হত্যার ঘটনা ঘটেই চলেছে। ধর্মের দোহাই দিয়ে ক্রমাগত মানুষ হত্যার হার বেড়ে যাওয়ার সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক জনেরা তাদের কাজের জন্য সরকার প্রদত্ত পুরস্কারগুলো একের পর এক ফেরত দিচ্ছেন। তাদের মাঝে কে নেই? ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরুর ভাগ্নি লেখক নয়নতারা সাহগল থেকে শুরু করে সারা জোসেফ, অশোক বাজপেয়ী, অরুন্ধতি রায় সহ বিভিন্ন ভাষার লেখক-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী ও চলচ্চিত্রকাররা। ‘দি গড অব স্মল থিংস’ এর লেখক অরুন্ধতি রায় বলেছেন:’ধর্মের কারণে ক্রমাগত হত্যাকে ‘অসহিষ্ণুতা’ বললে গুরুত্ব কম দেয়া হয়।…আর পুরুস্কার ফিরিয়ে দেয়া মানেই দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করা নয়।’

কিন্তু বাংলাদেশে ক্রমাগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ, নিরব দেশত্যাগে বাধ্য করা, জমি দখল, ধর্ষণ, লুটপাট, প্রকাশ্য খুনের পরও এদেশে তেমন কোন প্রতিবাদ আমরা দেখতে পাই না। মাঝেমাঝে রাজনীতির মাঠে সরব থাকার জন্য সংখ্যালঘু প্রসঙ্গে মুখস্থ বক্তৃতা দেখি। বিচার চাওয়ার প্রচলিত ভাষা জীর্ণ হয়ে গেছে বিচার না পাওয়ার কারণে। কয়েকদিন আগে এক সংখ্যালঘু গর্ভবতী নারীর পেটে লাথি মারে দুর্বৃত্তরা, তবু রাস্তায় নামতে হয় ভয়ে ভয়ে, পোস্টার নিয়ে:’তুলসী রাণীদের ছেলেরা কি কোনদিন আলোর মুখ দেখবে না?’ না। আমরা তেমন প্রতিবাদ দেখতে পাইনা। গত তিন বছরে বারো জন ব্লগার-লেখক-প্রকাশক খুন ও অনেকে মারাত্মক আহত হলেও দেশের প্রথিতযশা লেখকের তেমন জোরালো কোন বক্তব্য রাখেননি। ‘জাতিসত্তার কবি’রা সরকারী সুবিধা নিয়ে মত্ত, কেউ কেউ বুড়িয়ে গেছেন। কেউ বলেছেন ধর্মবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ এই দু’পক্ষ থেকেই লাশের মিছিল এগিয়ে চলেছে। এ কথা বলেছেন ফরহাদ মজহার, তাকে এখন ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদীরা ‘মুনাফেক’ বলে। ‘মুনাফেক’ এর তিনটি চিহ্ন: ১) যখন তারা কথা বলবে মিথ্যা বলবে (২) ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করবে (৩) বিশ্বাস ভঙ্গ করবে। কবি শামসুর রাহমান যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে অন্তঃত ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদীদের বিপক্ষে প্রতিবাদ মিছিলে গলা ছেড়ে শ্লোগান তোলার মতো অন্তঃত একটি কবিতা তার কলম থেকে আমরা পেতাম, কবি নিজেও ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদীদের আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। ভেবেছিলাম সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে একের এক ঘটে চলা ঘটনার প্রেক্ষিতে লেখকেরা সাংস্কৃতিকজনেরা তাদের প্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে প্রতিবাদ করবেন ও ব্যক্তিগত অবস্থান পরিস্কার করবেন, এভাবেই তারা নিজের মুখ আয়নায় স্পষ্টভাবে দেখবেন। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও তা হয়নি। কেউ বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধতে এগিয়ে আসেননি।

‘স্বাধীনতা পুরুস্কার’ এর মতো রাষ্ট্রীয় পুরুস্কার দেয়া হয়েছিলো একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে প্রকাশ্যে বিরোধিতাকারী শর্ষিনার পীর’কে? মুক্তিযুদ্ধে তার বিরোধিতামূলক কর্মকাণ্ডের দলিলপত্রও সুলভ। কিন্তু সে পুরুস্কার বাতিলের বারবার দাবি উঠলেও কোন সরকারই প্রদক্ষেপ নেয়নি। আমরা ভেবেছিলাম আওয়ামী লীগ সরকার যেহেতু ১৯৭১ এর মানবতাবিরোধী অপরাধীদের নেতাদের বিচার করছে, সেহেতু এ সরকারের শাসনামলেই ঐ ‘স্বাধীনতা পুরুস্কার’ উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে বাতিল করা হবে। কিন্তু তার কোন আলামত আমরা দেখছি না।

ভারতে এ মুহূর্তে যখন রাষ্ট্রীয় উচ্চ মর্যাদার পুরুস্কার ও পুরুস্কার বাবদ প্রাপ্ত অর্থ ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে তখন আরেকটি অন্যরকম প্রত্যাখ্যান দেখলাম। প্রত্যাখ্যানটি উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে থেকে। পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ারের ছাত্রী নবনীতা বৃন্দা সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর দেয়া বিনামূল্যের সাইকেল প্রতিবাদস্বরূপ ফিরিয়ে দিয়েছে। সে বলেছে সাইকেল না দিয়ে এ রাজ্যে নারীদের সুরক্ষা দিক সরকার। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘সবুজ সাথী’ প্রকল্পের আওতায় রাজ্যে ছাত্রীদের মাঝে বিনামূল্যে সাইকেল বিতরণ করছে। নবনীতা তার জন্য বরাদ্দকৃত সাইকেলটি ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে জানিয়েছে তার এলাকায় পম্পা দাস নামে একজন মেয়ের শরীর এসিডে মারাত্মকভাবে পুড়িয়ে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা। এখন পর্যন্ত সে ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রশাসন কাউকে গ্রেফতার করেনি। তাই তার কাছে এ সাইকেল নেয়া লজ্জাজনক বলে মনে হয়েছে। তার বক্তব্য সরকার ছাত্রীদের সাইকেল দিয়ে সাময়িক হাসি না ফুটিয়ে রাজ্যে নারীদের নিরাপত্তা দিক। এরকম বলিষ্ঠ প্রতিবাদ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মাঝে থেকেও উঠে আসতে পারে।

ঢাকায় প্রকাশক হত্যার পর লেখকরা প্রতিবাদ সমাবেশ, মিছিল, মশাল মিছিল করেছেন, প্রকাশকেরা বই পুড়িয়েও প্রতীকী প্রতিবাদ করেছেন। অথচ কোন লেখক রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ফেরত দেননি, সরকারকে অসন্তোষের কথা জানাননি। বেসরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত পুরুস্কার জনৈক চলচি্চত্রকার ফিরিয়ে দেবার ঘোষণা দিয়েছেন বিকল্প যোগাযোগ মাধ্যমে। তা গণমাধ্যম গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে সংবাদে প্রকাশ ও প্রচার করেছে। কিন্তু তাতেও বাংলাদেশি লেখকদের কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি। ভারতে ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় আক্রমণ বাংলাদেশেও প্রভাব ফেলবে। তাই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যে কণ্ঠটি ভারতীয় লেখকদের পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের স্বপক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারতো বলে আমার মনে হয় তিনি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরাটস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। শিক্ষাবিদ ড. আনিসুজ্জামান সাহিত্য ও শিক্ষায় বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৪ সালে ভারতের তৃতীয় বেসামরিক পুরুস্কার পদ্মভূষণ পেয়েছিলেন। তার জন্ম ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলার বসিরহাটে। তার পিএইচডির অভিসন্দর্ভের বিষয় ছিল ‘ইংরেজ আমলের বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানের চিন্তাধারা (১৭৫৭-১৯১৮)’।

অথচ এই ২০১৫ সালেই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ফিরিয়ে দিয়েছেন ৯৩ বছর বয়স্ক ন্যাপ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। এ রাজনীতিবিদ মুক্তিযুদ্ধের সময়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন, তিনি একমাত্র জীবিত সদস্য । তিনি দেশ স্বাধীন হবার পর মন্ত্রীত্ব নিতেও অস্বীকার করেছিলেন। তিনি পদক নিতে অনাগ্রহ জানানোয় তার নাম স্বাধীনতা পদক প্রাপ্তদের পরিচিতিমূলক গ্রন্থে রাখা হয়নি। কারণ তার দলের পক্ষ থেকে আগেই জানিয়ে দেয়া হয় তার অনাগ্রহের কথা। তিনি বলেন:’পদক দিলে বা নিলেই সম্মানিত হয়, এই দৃষ্টিভঙ্গিতে আমি বিশ্বাসী নই। দেশপ্রেম ও মানবতাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমি রাজনীতিতে এসেছিলাম, কোনো পদক বা পদ-পদবি আমাকে উদ্বুদ্ধ করেনি। সত্যিকার অর্থে যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন, তারা কেউই কোনো প্রাপ্তির আশায় নেননি। রাজনীতির অর্থ দেশ সেবা, মানুষের সেবা। পদ বা পদবীর জন্য কখনো রাজনীতি করি নাই। শেখ মুজিব আমাকে অনেক কিছু বানানোর চেষ্টা করেছিলেন আমি হই নাই। আমি মহাত্মা গান্ধী, মাওলানা ভাসানীর অনুসারী।”

আসলে পুরুস্কার প্রত্যাখ্যানে মানসিকতা লাগে। সেরকম মানসিকতা আমরা দেখিনা। স্বৈরশাসককে কোন এক কবি কবিতা লিখে দিতেন এমন শোনা যায়, সেসব কবিতা সে সময়ের পত্রপত্রিকায় ছাপা হত। বিনিময়ে সে কবি ঢাকায় গাড়িবাড়ি করেছিলেন। অথচ একই সময়ে অন্য এক কবিকে মফস্বল থেকে উঠে এসে বেঁচে থাকার জন্য টাকার জন্য পর্ণপত্রিকায় বেনামে রগরগে গল্প লিখতে হয়েছিল আমরা শুনেছি। বাংলাদেশি লেখকদের পুরুস্কার প্রত্যাখ্যানের মানসিকতা নেই, বড়জোর ম্যাড়ম্যাড়ে দু’চার লাইন ছন্দমেলানো প্রতিবাদ পদ্য-টকঝালমিষ্টি অথবা প্রতিবাদী গদ্যের নামে তার কিছু বাতিল শব্দ দিয়ে বানানো হা-পিত্যেশ। তারা ভালো আছেন, পুরুস্কার প্রত্যাখ্যান করে বা ফিরিয়ে দিয়ে রাষ্ট্র বা সন্ত্রাসবাদী কারোরই রোষানলে পড়তে চান না। বরঞ্চ জাতিসত্তার শব বহনের দায় যুক্তিবাদী তরুণদের কাঁধেই চাপাতে চান বা নিরব থাকতে চান এই বলে যে আপাতত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।

রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকরা, শিল্পসাহিত্য সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানে পদ দখল করে আছেন যারা তারা কেউই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াননি। তারা সমাজকে জাগিয়ে তুলতে এগিয়ে আসেননি।

আগামী প্রজন্ম যখন এ ইতিহাস পড়বে তখন তাদের মুখ কুঁচকে উঠবে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s