১৯৭১ এবং ইলা

images

১৯৭১। খুব ভোরবেলা দরজায় করাঘাতের শব্দ। মরিয়ম ভয় পেল। এতো সকালে কে হতে পারে? ঘরে সোমত্ত দুই মেয়ে। ইলা আর নীতু। ওরাও ভয় পেয়ে উঠে এসেছে। চোখে আতঙ্ক। বাড়িতে পুরুষ মানুষ বলতে সাত বছরের রবিন। রবিনের ছোট চাচা কাল রাতে জরুরী খবর পেয়ে কোথাও গেছে। কি খবর, কোথায় যাচ্ছে তা বলে যাননি। তাহলে কি রবিনের ছোট চাচা আজমল ফিরল? এমনটাই ভাবছিল মরিয়ম। দেখল, ইলা আর নীতু কাঁপছে। তার নিজেরও দুর্বল লাগছে।
– ‘ভাবি, আমি আজমল।’
মরিয়ম একটু আশ্বস্ত হল। মেয়ে দু’টোকে ইশারা করল অন্য ঘরে যেতে। ইলা আর নীতু ও ঘরের পর্দার পেছনে দাঁড়িয়ে এদিকে তাকিয়ে। মরিয়ম দরজায় প্রথম পাঁচটি টোকা দিল, ওদিক থেকে চারটি টোকার শব্দ শোনা গেলো, মরিয়ম আবার চারটি টোকা দিল, ওদিক থেকে তিনটি টোকার শব্দ হলো। মানে সঙ্গে বিপদ নেই।
চাপা গলায় শোনা গেলো আবার আজমলের গলা,
– ‘ভাবি, দ্রুত করেন, জামাল ভাইকে নিয়ে।’
মরিয়ম আর অপেক্ষা করতে পারল না। দরজা খুলে দিল। হুড়মুড়িয়ে ওরা ঘরে ঢুকলো। আজমল আর চাদর পরা দু’জন লোক। তাদের কাঁধে ভর রেখে জামাল। বয়স পঁয়তাল্লিশ প্রায়। গড়াপেটা স্বাস্থ্য। দাড়িভরা মুখ।

আজমল পরিচিত করে দিল অপরিচিত দু’জনকে। ওরা মুক্তিযোদ্ধা; একজন ইসমাইল, অন্যজন সালেহ। ইসমাইল লম্বা মতো ছেলেটা, বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ হবে। সালেহ ত্রিশের কোঠায়। জামাল যে ইউনিটের দায়িত্বে, ওরা দু’জনও ওখানেই আছে।
– ‘ভাবি, তুলো আছে?’
– ‘কেন?’
এবার আজমল করুণ দৃষ্টিতে তাকালো।
– ‘ভাই’র গুলি লেগেছে।’
আস্তে আস্তে জামালের পেটের ওপর থেকে চাদরটা সরিয়ে দিলো সে।
– ‘খবর পেয়ে আমি গেলাম। কিন্তু এখানে আনতে চেয়েছিলাম না, কমাণ্ডারও চাইছিলেন না, আপনাদের অসুবিধে হতে পারে, কিন্তু জামাল ভাই খুব জোর করলেন, উনি কোন কথা শুনছিলেন না, আমাদের আর করার কিছু ছিল না। আমাদের একটা ইউনিট কাছাকাছি এদিকেই আছে। তাই কমাণ্ডার পাঠালেন। যদিও রিস্ক আছে, রাজাকারগুলো টের পেয়ে গেলে….। সেক্ষেত্রে আপনাদেরও এ বাড়ি ছেড়ে কোথাও শেল্টারে যেতে হতে পারে। তাই সাবধান…’
মরিয়ম স্বামীর দিকে তাকাল। দেখলেন কাতরে উঠছে জামাল। কান্নার একটা দলা পাকিয়ে উঠতে চাইলেও কোৎ করে গিলে মরিয়ম বললো,
– ‘তুলো নিয়ে আসি। খাটের ওপর শোয়ান ওনাকে…’
দ্রুত ঘর ছাড়ে মরিয়ম, পর্দার ওপাশে দাঁড়ানো মেয়েদের সঙ্গে একরকম ধাক্কা খেতে খেতে ও ঘরের দিকে ছুটল। তার কান্নার শব্দ চাপা পড়ে গেল মেয়েদের কান্নার স্বরে।
ইলা আর নীতু ওদের বাবাকে ধরে খাটে শোয়ালো।

২.
তৃতীয় দিন সন্ধ্যার পরে জামাল মারা গেল। জামাল বারবার বলে গেছে, তার কবরে যেন তার প্রিয় রাইফেলটি দেয়া হয়, এ বাড়িতে নিয়ে আসার আগে কমাণ্ডারকে অনেক অনুনয়-বিনয় করে রাইফেলটি নিয়ে এসেছিলেন। যখন আহত অবস্থায় বাড়িতে ফিরেছিলেন ভাই আজমল, ইসমাইল আর সালেহকে নিয়ে, সেদিন খুব ভোরবেলা ছোট্ট একটি গাড়ি এ বাড়ির সামনে জামাল ও তার ছোট ভাই আজমল, দুই মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল-সালেহকে নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিলো। কাছাকাছি একটা ইউনিট অপেক্ষা করছে ইসমাইল ও সালেহ’র জন্যে।
কিন্তু মরিয়ম চাচ্ছে না, সে চায় না রাইফেলটিকে জামালের কবরে দিতে। এমনিতেই মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রের সংকট, এখনি কি করে স্বপ্নকে কবর দেয়া যায়।
যদিও আজমল বারবার বলছিলো,
– ‘ভাবি, ভাইজানের শেষ ইচ্ছা রাখবেন না?’
– ‘না, স্বপ্নের মৃত্যু হয় না।’
ইসমাইল বললো,
– ‘আজমল ভাই চলুন, ভাইজানের কবর দিয়ে আসি। সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। আজ রাতেই আমরা ক্যাম্পে ফিরে যাবো। কাল অপারেশন আছে। জামাল ভাই মাটির ঘরে ঘুমিয়ে থাকবে আর আমাদের রাইফেল শব্দহীন হয়ে থাকবে তা হবে না।।

download (2)

৩.
ফিরে যাবার সময়ে ইসমাইল বলেছিলো,
– ‘রাইফেলটা নিয়ে আসুন, আমরা যাবো।’
– ‘রাইফেলটা আমি দেবো না।’ মরিয়মের কথায় ঘরে যেন বাজ পড়লো। আজমল, মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল, মুক্তিযোদ্ধা সালেহ, জামাল-মরিয়মের মেয়ে ইলা-নীতু সকলেই থ হয়ে তাকালো মরিয়মের দিকে।
চাপাস্বরে আজমল ডাকলো, ‘ভাবি…’
সালেহ বেশ চুপচাপ স্বভাবের। তিনদিন হল এসেছে, তেমন কোন কথা বলেনি। কিন্তু সেও অবাক হয়ে জানতে চাইলো, ‘কেন?’
– ‘আমার স্বামীর প্রিয় জিনিসটি আমাদের কাছেই থাকুক। একদিন দেশ স্বাধীন হবেই।’
– ‘কিন্তু অস্ত্র যেহেতু জামাল ভাইয়ের কবরে দেননি, ওটা আমাকে ঘাঁটিতে ফেরত দিতে হবে।’
– ‘তোমার বোন যদি চাইতো স্বামীর প্রিয় জিনিসটি থাকুক, তুমি কি ফেরাতে পারতে?’
– ‘এখন আবেগের সময় নয়…’ সালেহ আরো কি যেন বলতে চাচ্ছিলো, ইসমাইল তাকে থামালো।
– ‘সালেহ থাম্। আচ্ছা ভাবি, গুলিগুলো?’
– ‘ওগুলোও থাক।’
– ‘কিন্তু আপনাদের কাছে রাইফেল আছে কেউ জানলে বিপদ হবে। এমনিতেই দু’মেয়ে…’
– ‘কেউ জানবে না…’
– ‘এমনকি মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ নয়…কি বলো সালেহ?’
– ‘হ্যাঁ, জামাল ভাইয়ের সাহসিকতা আমরা ভুলবো না। গুলি খাওয়ার পরও লাইট মেশিনগান চালিয়ে গেছেন। কিন্তু আমরা তাকে ফেলে রেখে রিট্রিট করিনি।’
– ‘আপনারা সাবধানে থাকবেন। কোন রকম বিপদ টের পেলে এ জায়গা ছাড়বেন। পাকিস্তানিরা আর কিছুদিন পরেই পালাতে শুরু করবে, তার আগ পর্যন্ত আমরা শহরের কাছাকাছি আছি। দরকার হলে আজমল ভাই আপনাদের নিয়ে যাবেন…’
– ‘হ্যাঁ…’ আজমল বললো।
– ‘আপনি কোন রকম বিপদ মনে করলে যোগাযোগ করবেন, শেল্টারে যাবার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তারপর এসে আপনিও আমাদের সঙ্গে যোগ দিবেন।…আমি গিয়ে বলবো জামাল ভাইয়ের কবরে দেয়া হয়েছে রাইফেলটা। ঠিক আছে তো?’
– ‘আচ্ছা।’
– ‘জয় বাংলা।’
– ‘জয় বাংলা।’
এরপর ইসমাইল আর সালেহ বেরিয়ে গেল।
ইলা ছাদে দাঁড়িয়ে দেখলো একটি ছোট্ট গাড়ি এসে ওদের নিয়ে গেল।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s