মুক্তবুদ্ধি প্রকাশের প্রতিবন্ধকতা

download (3)

‘আমার বুদ্ধি নেই, যা চোখে দেখি তাও বুঝতে পারিনে,
যা না দেখি তা আরো ভুল বুঝি।’
কথাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসের। সাহিত্যের কথা আজ থাক। আজ একটু অন্যদিকে মন দেই। আজকের সমাজে মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের নিজেকে প্রকাশ করার প্রতিবন্ধকতা নিয়ে লিখতে বসে প্রথমেই রবীন্দ্রনাথের কথাগুলো মাথায় এল। পাঠস্মৃতিতে ছিল তাই। মুক্তবুদ্ধির প্রকাশ! এই ২০১৫ সালে জঙ্গিবাদের রমরমা সময়ে কথাটা শুনলে অনেকে চমকে উঠবে। ছোটবেলায় ভাড়াবাড়িতে থাকতাম। একদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে শুনলাম বাড়িওয়ালার কাজের মেয়েকে বদজ্বীনে ধরেছে, তাই তাকে ঝাড়ুপেটা করা হচ্ছে। আগের রাতে বেশ গরম পড়েছিল, তাই মেয়েটি মাদুর পেতে ছাদে ঘুমিয়েছিল। কিন্তু আসল ঘটনা ফাঁস হয় পরদিন। মেয়েটির মা দেখতে আসার পরে দেখি পুলিশও এল। ঘটনা কি? জানা গেল মেয়েটি ধর্ষণের শিকার হয়েছিল সে রাতে। তারপর থেকে সে অস্বাভাবিক আচরণ করছিল।

আবার মনে করুন আমরা জাদুর খেলা দেখে বিগলিত হই। তাসের খেলা, উধাও হয়ে যাওয়া, এমনকি ধড় আলাদা করে ফেলার মত বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে যাওয়া খেলাও আছে। এই যে দেখুন আমরা এতদিনে জেনে গেছি জাদু আসলে এক ধরনের খেলা, মানুষকে বিনোদন দেয়ার মাধ্যম, জাদু দেখানো পেশাটি যদিও এখনও খুব কম লোক বংশানুক্রমে ধরে রাখতে পেরেছেন এ পুঁজিবাদী সমাজে। সমাজ এখন নতুন নতুন ভেলকি চায়, চায়ের কাপে ঝড় চায়। এই যে জাদু–এর পেছনে আছে বিভিন্ন কৌশল, বিজ্ঞান ও প্রয়োগ-পদ্ধতি। সেসব আয়ত্ব করেই একজন জাদুকর পেশাদার হয়ে ওঠেন ও খেলা দেখান। গণিতের জাদু বলে যেসব প্রচলিত আছে সেসব গণিতের সূত্র। জাদুর প্রসঙ্গ যখন উঠলই তখন কালো জাদুর কথা কেন বলব না? তন্ত্র শাস্ত্র-মন্ত্র শাস্ত্র, কালো জাদু বা তুকতাক হল প্রতারণা। ডাইনিদের ব্লাক ম্যাজিক অথবা রাবারের পুতুলের গায়ে কারো পোষাকের কাপড়ের টুকরো জড়িয়ে সুঁই ফুটিয়ে সে লোকের ক্ষতি করার কল্পকাহিনী আমরা লোকগল্পে শুনেছি। কিন্তু মনের মানুষকে বা প্রেমিকাকে বা স্বামীকে বা স্ত্রীকে বশীকরণের বিজ্ঞাপন হরহামেশা আমরা এই আধুনিক যুগের টেলিভিশনে রোজ দেখি যা আসলে কালো জাদুর অন্তর্গত ও প্রতারণা। অথচ এ ধরনের বিজ্ঞাপন টেলিভিশন চ্যানেলের বিজ্ঞাপন প্রচার নীতিমালার ফাঁক গলে আলোর মুখ দেখার কথা নয়।

এবার আসি ধর্মের কথায়। আমাদের ধর্মগুলোর ও এগুলোর আচারআচরণের বয়স অনেক। সে হিসেবে ধর্মের অধিকাংশ রীতিনীতি আজ পুরনো। অনেকে মানেও না। আপনি কি আপনার মেয়েকে শরিয়া আইনানুযায়ী বাল্যবিবাহ দেবেন? হিন্দুধর্ম থেকে সতীদাহ প্রথা রদ হয়েছে, বিধবা বিবাহ চালু হয়েছে। এখনও পুজোর নামে অনতি তরুণ ব্রাহ্মণের পাঁ ছুঁয়ে প্রণাম করেন পরিবারের বয়স্ক ব্যক্তি। এখন যদি আপনি একজন মুক্তবুদ্ধির মানুষ বা যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে প্রকাশ্যে এসবের বিপক্ষে বলেন তাহলে কিন্তু আপনি মৌলবাদীদের আক্রমণের শিকার হবেন। বলবেন নাই বা কেন? কাউকে না কাউকে তো বলতে হবে। কাজী নজরুল ইসলাম তখনকার দিনেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে হিন্দু লেখকরা তাদের সমাজের কুপ্রথাকে পরিবর্তন করার জন্য লেখার মাধ্যমে কী কষাঘাতটাই না করেছেন, তবুও তারা মানুষের শ্রদ্ধা হারাননি। কিন্তু ইসলামের সংস্কার নিয়ে কথা বললে উগ্রবাদীরা হয়তো লেখককে ছুরি মারবে। কাজী নজরুলের কথা আজ সত্যি হয়েছে। বাংলাদেশেও যেমন মুক্তবুদ্ধির লেখকরা জীবন দিচ্ছেন গুপ্তঘাতকের ছুরির নিচে, তেমনি ভারতেও কট্টর হিন্দু মৌলবাদীরা বসে নেই। তারা আবার এক কাঠি সরেস। গরু নিয়ে নানা কেচ্ছাকাহিনী করে উত্তেজনা বৃদ্ধি করে ধারাবাহিকভাবে মানুষ হত্যা করছে।

মুক্তবুদ্ধির মানুষ হিসেবে আপনি যখন নিজেকে প্রকাশ করবেন তখন আমাদের দেশে প্রথম বাঁধা আসে পরিবার থেকে। তারপর সমাজ থেকে, রাষ্ট্র থেকে, উগ্রবাদীদের থেকে। পরিণাম পরিবার থেকে বিতাড়িত বা ত্যাজ্য, সমাজ থেকে এড়িয়ে চলা, রাষ্ট্র কর্তৃক গ্রেফতার, অথবা উগ্রপন্থীদের ছুরির নিচে গলা। গত কয়েক বছর ধরে ইন্টারনেটে ধর্ম নিয়ে মুক্তমত প্রকাশ করায় পিতা ছেলেকে ত্যাজ্য করেছেন নোটারি পাবলিকের ঘোষণা সম্বলিত কয়েকটি বিজ্ঞাপন আমরা লক্ষ্য করেছি। আর সমাজের রোষানল তো প্রায়ই দেখি। গত কয়েক বছর ধরে ধর্মের কথিত সমালোচনা করায় বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় গ্রেফতার নিয়মিত ঘটনায় দাঁড়িয়েছে। সুদূর সৌদি আরবে কর্তৃপক্ষের অবহেলায় হজ্বে পদদলনে হাজারের ওপর মানুষ নিহত হবার ঘটনা নিয়ে ফেসবুকে মন্তব্য করায় পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছিলেন একজন পরিবেশকর্মী। গত তিন বছরে গুপ্তহত্যা হয়েছেন বারোজন প্রগতিশীল ও মুক্তমনা লেখক-ব্লগার-প্রকাশক-অনলাইন একটিভিস্ট।

আমরা জানি যুক্তিবাদী মানুষের মস্তিষ্কের গঠন আলাদা। তবু জ্ঞানপিপাসী মানুষ যদি পড়ে ও জীবনাভিজ্ঞতার আলোকে যদি যুক্তিবাদী হয়ে নিজের মত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে চায় তবে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, উগ্র সন্ত্রাসবাদী জঙ্গী–এই চার চক্রে পড়ে তার আর বাঁচার কোন উপায় থাকে না। তাই এখন নিজেকে আড়ালে রেখে ছদ্মনামে ব্লগ হয়ে উঠেছে যুক্তিবাদীর নিজস্ব অভিমত প্রকাশের জায়গা। ব্লগাররা সাংবাদিক নন; তারা তাদের চারপাশে সমাজচিত্র তুলে ধরে সামাজিক সাংবাদিকতা করবেন তা নয়, তারা নিশ্চয় মানুষের কিছু অন্ধ বিশ্বাসের জায়গাগুলো ভেঙে দিতে চাইবেন–কেননা তারা সমাজের ভেতরেই থাকা মানুষ যারা মনকে জাগাতে চান। যুগে যুগে বিজ্ঞান ও যুক্তি এগিয়ে গেছে। কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা হয়েছে। যুক্তিবাদী মানুষদের চিন্তকদের মেরে ফেলা হয়েছে। কিন্তু ঐ মানুষগুলোর দেখানো পথে পরবর্তী কালের মানুষেরা সুবিধা ভোগ করেছেন। উগ্রপন্থীরা সন্ত্রাসের পথ বেছে নেয়ায় ভুল করেছে। এখন লেখা আরো বেনামে ছড়িয়ে পড়বে। সবাইকে ওরা খুন করতে পারবে না। ওরা যতবার খুন করবে ততবার ওদের আদর্শিক পরাজয় হবে। একজন অভিজিৎ রায়কে মেরে ফেলা হলে আরেকজন অভিজিৎ রায় জন্ম নেবে; একজন দীপনকে হত্যা করা হবে আরেকজন দীপন জন্ম নেবে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s