কেন ছিটমহল থেকে ভারতের আশ্রয়ে মানুষগুলো

download (2)

দশমী’র কথা দিয়ে লেখাটি শুরু করা যাক। ছোট্ট মেয়েটির নাম দশমী। গত দূর্গাপুজার বিজয়ার দিনে জন্ম হয়েছিল তার, তাই নাম রাখা হয় দশমী। বাংলাদেশের মধ্যে ভারতের অধুনালুপ্ত ছিটমহলে জন্ম নেয়া শিশুটি বাবা-মায়ের সঙ্গে চলে গেছে ভারতে। বাবা মুকুল চন্দ্র রায়, মা সন্ধ্যা রানী। গত ৩১ শে জুলাই বাংলাদেশ-ভারতের ছিটমহল বিনিময়ের আগে তারা ভারতে যাওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছিল। মুকুল চন্দ্র রায়-সন্ধ্যা রানী চলে গেল। সঙ্গে নিয়ে গেল বাংলাদেশের জীবন্ত স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে মেয়েটিকে। যে স্মৃতিচিহ্ন শুধু তাদের ছেড়ে যাওয়া জন্মভূমি বাংলাদেশের নয়, যে স্মৃতিচিহ্ন শুধু ভালবাসার নয়–এ স্মৃতিচিহ্ন বলা যায় বাংলাদেশের ব্যর্থতারও। কেননা বাংলাদেশ তাদের কোন আশাভরসা দিতে পারেনি, দিতে পারেনি কোন সম্ভাবনা বা আলোকরেখা।

বাংলাদেশ-ভারতের ছিটমহলের সংখ্যা ছিল মোট ১৬২টি। তার মাঝে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ১১১টি, আর ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি। গত ৩১ শে জুলাই বাংলাদেশ ও ভারতের মাঝে আনুষ্ঠানিকভাবে ছিটমহল বিনিময় হয়ে গেছে। ভারতের ছিটমহলগুলো ছিল বাংলাদেশের–লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, নিলফামারীতে। লালমনিরহাট জেলার বাঁশমারি ছিটমহলের প্রাক্তন বাসিন্দা বিনোদ চন্দ জানিয়েছেন তার সব আত্মীয়-স্বজনরা ভারতে থাকেন, তাই তিনি চলে গেছেন। পঞ্চগড় জেলার আরেকটি অধুনালুপ্ত ছিটমহলের বিজয় কুমারের তিন ছেলে ভবিষ্যতের আশায় চলে গেছেন দেশ ছেড়ে ভারতে; কিন্তু বিজয় কুমার এ বয়সে জীবনযুদ্ধে নতুন করে মুখোমুখি হতে পারবেন না, তাই তার বৃদ্ধা স্ত্রীকে নিয়ে থেকে গেছেন বাংলাদেশে। লালমনিরহাটের বাঁশকাটা ছিটমহলের উকিল চন্দ্র যাবার আগে বলেন:’জন্মভূমি ছেড়ে গেলাম। জানিনা, ওখানে জন্মভূমির মতো মাতৃছায়া পাব কিনা? আমার জন্য আশির্বাদ চাই। হয়তো আর কোনদিন দেখা হবে না। এ দেখাই যে শেষ দেখা হবে, কখনোই ভাবিনি।

১৮ নভেম্বর বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে যায় লালমনিরহাট জেলার গোতামারি ছিটমহল থেকে স্থানান্তরের জন্য আবেদন করা প্রথম দলটি। এ দলে ছিল নারী-পুরুষসহ মোট ৬৩ জন। নিজেদের বাপ-দাদার বসতভিটা ছেড়ে যেতে কান্নায় ভেঙে পড়া মানুষের হাহাকারে ভারি হয়ে উঠেছিল বুড়িমারি স্থলবন্দরের বাতাস। তবুও উপায় নেই, যেন দেশত্যাগই তাদের নিয়তি। সেই ১৯৪৭ হোক বা ২০১৫, চিত্র একই। এ দেশত্যাগীদের দলে দশমী ও তার বাবামাও ছিল। ভারতের পক্ষ থেকে উচ্ছ্বসিত আয়োজন ছিল, মিষ্টি খাইয়ে, ঢোল বাজিয়ে-ফুলের মালা পড়িয়ে, স্থাপিত মঞ্চে আঞ্চলিক নৃত্যগীত সহকারে উষ্ণ অভ্যর্থনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখন কেমন কাটবে ভারতে তাদের প্রাথমিক দিনগুলো? ভারতে তাদের জন্য অস্থায়ী ক্যাম্প করা হয়েছে, আগামী দু’বছর এখানেই থাকতে হবে। এরপর পাকা দালানবাড়ি নির্মাণ করে দেয়া হবে, পাঁচ লাখ টাকা করে পরিবারপ্রতি সহায়তা দেবার আশ্বাস দেয়া হয়েছে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে। আপাতত ছিটমহল থেকে আসা ক্যাম্পে প্রতিটি পরিবারের জন্য দুই রুম বিশিষ্ট একটি টিনের চালাঘর তৈরি করা হয়েছে। কোন কোন পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৯ জন। ২০ জন নারীপুরুষের জন্য একটি করে শৌচাগারের ব্যবস্থা। এক মাস খাবার সরবরাহ করা হবে। তারপর থেকে রেশন দেয়া হবে। এভাবে চলবে দুই বছর। আপাতত স্থায়ী কোন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই। যারা এভাবে দেশত্যাগ করলেন তারা গিয়েছেন স্বেচ্ছায়, ভবিষ্যতের আশায়, জমি-সহায় সম্পদ বিক্রি করতে পেরেছেন, কোন অস্থাবর সম্পত্তি নিতে পারেননি।

ছিটমহল অধিবাসীদের মাঝে যারা দুই দেশের প্রশাসনিক সহায়তায় ভারতে চলে গেলেন স্থায়ীভাবে তাদের মাঝে যে শুধু হিন্দু ধর্মালম্বীরা আছেন, তা নয়। বেশ কিছু মুসলিম ধর্মালম্বীও আছেন। তাদের একজন কুড়িগ্রাম জেলার সদ্যবিলুপ্ত দাশিয়ারছড়া ছিটমহলের প্রাক্তন বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন। জয়নাল আবেদীন ২৩ বছর আগে বিয়ে করেছিলেন একই এলাকার আকলিমাকে। সম্পদ বলতে ১৩ শতক জমির উপরে বসবাসের ৪টি টিনের ছাপরাঘর। দিনমজুরিতে কাটতো সংসার। বাবা মারা গেছেন ৮ বছর আগে। তো, জয়নাল আবেদীন মা, স্ত্রী, এক ছেলে ও তিন মেয়ের মায়া ত্যাগ করে গত ২৪ নভেম্বর একাই ভারতে চলে গেছেন। তার বড় ছেলে কাজ করে ভারতের হরিয়ানার একটি ইটভাটায়। জয়নাল আবেদীন যাবার আগে আক্ষেপ করে গেছেন, তিনি দেশত্যাগ না বলে বলেছেন ভারতের নাগরিকত্ব বহাল রাখা কথাটি:’আমি ভারতের নাগরিক। কেউ কোটি টাকা দিলেও আমি বাংলাদেশে থাকব না। এ দেশে থেকে উন্নতি হবে না। ভারতে গেলে কাজ মিলবে।’ (দৈনিক যুগান্তর, ২১ নভেম্বর ২০১৫, পৃষ্ঠা-৩)

images

ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশি ছিটমহলগুলো  যেগুলো এখন ভারতের মানচিত্রে বিলীন হয়েছে সেখান থেকে কেউ বাংলাদেশে ফিরে আসেনি। অথচ বাংলাদেশের ভেতরে ভারতে র ১১১টি ছিটমহলের ৩৭০০০ বাসিন্দার ৯০০ জন ভারতে চলে যাওয়ার আবেদন করেছিলেন। পরে বেশ কিছু ব্যক্তি মত পরিবর্তন করে থেকে গেছে যদিও। হিন্দু-মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বা ধর্মীয় জাতিপরিচয়ের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময়ে ভুল সিদ্ধান্তের কারণে সৃষ্ট ছিটমহলে ৬৮ বছরের বন্দী দশা অন্তঃত কাটলো মোট ৫১০০০ হাজার মানুষের। তারা এতোটা বছর পায়নি উল্লেখযোগ্য কোন নাগরিক সেবা, শিক্ষা, নিরাপত্তা, চিকিৎসা, বিদ্যুতের পর্যাপ্ত সুবিধা। এখন জমির হিসেবে বাংলাদেশের লাভ অনেক। কেননা এ ছিটমহল বিনিময়ে মানচিত্রের সমাধান হয়েছে, বাংলাদেশ-ভারতের মোট ১৬২ টি ছিটমহল ছিল, তার ১১১ টি ছিটমহল থেকে ১৭০০০ একরের বেশি জমি পেয়েছে বাংলাদেশ, আর ভারত ৫১টি ছিটমহল থেকে পেয়েছে  ৭০০০ একরের বেশি জমি। কিন্তু মানুষগুলোকে আমরা রাখতে পারলাম না; তারা চলে গেলেন অনেক ব্যথা নিয়ে, বেদনা নিয়ে। জন্মভূমি ত্যাগ করার যে কষ্ট নিয়ে তারা চলে গেলেন তা তাদের বাকীটা জীবন তাড়িয়ে বেড়াবে। অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধাও চলে গেলেন তাদের সন্তান-সন্ততিদের বাংলাদেশে রেখে, সন্তানদের দূর দেশে রেখে তাদের তো এখন স্বাভাবিক দিন কাটবে না। বাংলাদেশের ক্রমাগত সংখ্যালঘু নির্যাতন, নিরাপত্তাহীনতা ও সমাজের বড় একটি অংশের দৈন্য দৃষ্টিভঙ্গির কারণে হিন্দু সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগের যে মিছিল শুরু হয়েছিল কয়েক দশক আগে তা শতাব্দীর একটি নতুন শতকের বেশ কিছুটা সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও থেমে নেই। শুধু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিত আলাদা, দেশত্যাগ চলছেই। অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিবেচনায় ছিটমহলের এই মানুষগুলো দেশ ছেড়েছে।

ছিটমহল সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে দু’টি দেশের বর্তমান সরকার আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছে। ছিটমহলবাসীরা তারা নিজেদের মতামত জানাতে পেরেছেন যে তারা কোন্ দেশে থাকবেন। সেসব তাদের ইচ্ছেয় ঘটেছে। কিন্তু এই এতগুলো মানুষের দেশত্যাগকে আমি কোনভাবেই খাটো করে দেখিনা, তারা অনেকেই তাদের বুকের ভেতরের অনেক কথা অকপটে বলতে পারেননি। তাদের মাঝে অধিকাংশ হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের, এমনকি কিছু মুসলিম ধর্মালম্বীরাও বাংলাদেশে তাদের ভবিষ্যতের জন্য ভাল কিছু প্রত্যাশা করেননি। কেননা আমাদের সমাজচিত্র এখন এ রকম। এটা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। কিন্তু তারা ভারত গিয়েও কি ভাল থাকবে? ভারত সরকারও কি তাদের প্রত্যাশা পূরণ করবে? ভারত সরকার কি তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি রাখবে? তাদের স্থায়ী কর্মসংস্থান হবে? তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে? কবে? এমন অনেক প্রশ্ন থেকে যায়। স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হয়তো মুছে গেল ছিটমহল নামে বঞ্চনার ৬৮টি বছর, যারা বাংলাদেশে থেকে গেল তাদের জন্য বাংলাদেশ বিদ্যুত-ঋণ সহায়তা সহ নতুন নতুন প্রকল্প হাতে নেবে, কিন্তু আমরা কি কখনো ভুলতে পারব যে মানুষগুলো নিরবে দেশত্যাগ করে তাদের কথা অথবা তারা কি ভুলতে পারবে শেকড়ের কথা? ভাল থেকো, দশমী। ভাল থাকবেন, জয়নাল আবেদীন।

 

Advertisements