কটুক্তি করা হয়েছে কথাটি বাংলাদেশে এখন নির্যাতনের নতুন কৌশল

th

ধর্মগ্রন্থ। মানুষের আশ্চর্য মোহের নাম। কয়েক পৃষ্ঠার বইয়ে রূপকথার মতো সব অবিশ্বাস্য গল্প, যার কোন বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী ভিত্তি নেই। আর যার বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিবাদী ভিত্তি নেই তাকে আমরা মানতে পারি না। বাংলাদেশে প্রতি মাসে কোরান নিয়ে কটুক্তির কারণে গ্রেফতারের ঘটনা চোখে পড়ে। সাম্প্রতিকতম উদাহরণটি হল শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলার জয়নগর জুলমত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান শিক্ষক তপন চন্দ্র বাড়ৈ। তিনি রসায়ন ক্লাসে নাকি কোরান বিরোধী কথাবার্তা মঙ্গলবার দিন বলেন। পরদিন শিক্ষার্থীরা ক্লাশ না করে এলাকাবাসীদের নিয়ে রাস্তা আটকে বিক্ষোভ শুরু করলে পুলিশ এসে তপন চন্দ্র বাড়ৈকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। লেখালেখির সূত্রে সারা বাংলাদেশে লেখক ও গুটিকয়েক সাংবাদিককে চিনি। সে সূত্রে শরীয়তপুরের একাধিক সাংবাদিককে ফোন করি। কিন্তু তারা কেউ জানাতে পারেনি আসলে তপন চন্দ্র বাড়ৈ ক্লাসরুমে ঠিক কি মন্তব্য করেছিলেন কোরান সম্পর্কে যে তাকে জোর করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হল।

Shariatpur Pic-01

স্কুল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নিরপত্তার জন্য তাদের আর কিছ্ইু করার ছিল না। সংগৃহিত তথ্যসূত্র বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাই তপন চন্দ্র বাড়ৈ আদৌ কি বলেছেন তা কেউ জানে না, কোন এক ছাত্র গিয়ে এলাাকাবাসীকে কিছু একটা বলেছে আর সে কথা বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এবং সকলে রাস্তায় নেমে এসেছে। পরে স্কুল কমিটির সিদ্ধান্তে এ শিক্ষককে চাকুরী থেকে বরখাস্ত করা হয়।

বাংলাদেশে বাক প্রকাশের যে স্বাধীনতার উপর খড়গ নেমে এসেছে, তার কয়েকটি উপাদান আছে। তার মধ্যে ধর্মগ্রন্থ নিয়ে তথাকথিত কটুক্তির কারণে গ্রেফতার ও কারাগার বন্দী করে রাখার মতো ঘটনায় মানবিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। ৫ নভেম্বর নোয়াখালী জেলার চাটখিলে ফেসবুকে কোরানের আয়াতের মাঝে যুক্তি দিয়ে তিনটি আয়াত ভুল বলে মন্তব্য করার কারণে গ্রেফতার হয় পঁচিশ বছরের তরুণ যুবক লিটন চন্দ্র নাথ। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মাঝে উত্তেজনা বিরাজ করে ও পুলিশ এসে লিটন চন্দ্র নাথকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। সে গ্রেফতার হয় আইসিটি এক্টের ৫৭ ধারায়। আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা একটি কালো আইন। এ আইনের বদৌলতে যে কাউকে বিনা বিচারে জামিন না দিয়ে কারান্তরীণ করে রাখা যায়। বাংলাদেশের মৌলবাদীরা দীর্ঘদিন ধরে ব্লাসফেমি নিয়ন্ত্রণে আইনের আবেদন জানিয়ে আসছিল। সরকার সরাসরি ব্লাসফেমি আইন নাম দিয়ে সে আইন তৈরি না করলেও এ তথ্যপ্রযুক্তি বা আইসিটি আইনকে অনলাইনে লেখালেখি ও সমালোচনা বন্ধের জন্য একে অনেকটা ব্লাসফেমি আইন হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারাটি বাকস্বাধীনতাবিরোধী বিধায় এ ধারাটি বাতিল বা পরিবর্তনের জন্য লেখক, আন্দোলনকারীরা, মানবাধিকারকর্মীরা, সংবাদকর্মীরা, সচেতন মহল সরকারের কাছে বারবার অনুরোধ জানিয়ে যাচ্ছে। কেননা এ আইনে র এ ধারায় ঠিক কি কারণে বা কি লিখলে অপরাধ সংঘটিত হতে পারে তা সংজ্ঞায়িত নয়। ৫৭-এর ১ উপধারায় শুধু বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে প্রদান করা হয়, তাহা হইলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ।’ অপরাধের শাস্তির বিষয়ে ৫৭ ধারার ২ নম্বর উপধারায় বলা হয়, ‘কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১)-এর অধীন অপরাধ করিলে তিনি অনধিক চৌদ্দ বছর এবং ন্যূনতম সাত বৎসর কারাদণ্ডে এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’ যা সাধারণ কোন ফৌজদারী অপরাধের থেকে চরম দণ্ড। তাছাড়া এ আইনে পুলিশকে সরাসরি মামলা করার ও পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এবং জামিন নাও দেয়া যেতে পারে। এ আইনের যথেচ্ছ অপব্যবহার হতে পারে। বাংলাদেশের সংবিধানের মূল চেতনা যে মূল চেতনা বাক প্রকাশরে স্বাধীনতা তার সঙ্গে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা সাংঘর্ষিক। এই ধারাটি সংবাদপত্র ও নাগরিকের স্বাধীনতাকে খর্ব করছে, যা সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। ৩৯ অনুচ্ছেদে দেশের সব নাগরিকের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কতিপয় শর্ত সাপেক্ষে নাগরিকের বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

imagesimages

ধর্মগ্রন্থ ছাড়াও মুসলমানদের নবী মুহম্মদকে নিয়ে কটুক্তির অভিযোগে গ্রেফতারের ঘটনা আছে। এ ধরনের ঘটনাগুলো পরে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বা ব্যক্তিগত শত্রু হিসেবে ঘায়েলের জন্য এরকম অসংখ্য ঘটনা পরিকল্পিত ভাবে ঘটনো হয়েছে। যেমন ২০১১ সালের নভেম্বরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার দেবাশিস দাস সোহেলের ঘটনাটি। দেবাশিস দাস সোহেল ফেসবুকে নবী মুহাম্মদকে নিয়ে কটুক্তি করেছে এ কথা ছড়িয়ে দেয়া হয়, এবং সে সূত্র ধরে তার গ্রামের টানপাড়া, দাসপাড়া ও কান্দাপাড়ার মতো তিনটি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাতে ৬০ থেকে ৭০ জন লোকে হামলা করে মন্দির গুড়িয়ে দেয় ও বাড়িঘরে ভাংচুর লুটপাট করে। দেবাশিস দাস সোহেলকে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় গ্রেফতার করা হয়।

এখন যদি বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও ব্লগের দিকে একটু নজর দিই তাহলে কটুক্তির অভিযোগে মাত্রা যে কিরকম ব্যাপক আকার ধারণ করেছে তা সহজে বুঝতে পারবো। পাঁচওয়াক্ত নামাজ না পড়ে প্রতিদিন দু’ ঘণ্টা করে ইংরেজি পড়তে বলায় ২০১৩ সালের মার্চে গোপালগঞ্জ জেলার কোটালিপাড়ার একটি স্কুলে দেবব্রত রায় নামের এক শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়।  ২০১৪ সালে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় কটূক্তির অভিযোগে প্রসেনঞ্জিৎ চন্দ্র শীল নামে এক শিক্ষকের উপর মামলা-হামলার অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে তিনি গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে নিরুদ্দেশ হন। সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার নলতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সুশান্ত কুমার ঢালীকে কটূক্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। ক্লাস চলাকালে তিনি বলেছিলেন, “এক জায়গায় একজন হিন্দু সাধু, একজন মুসলমানদের মৌলভী ও একজন বিদেশী ভদ্রলোক ছিলেন। এদের মধ্যে প্রথমে হিন্দু সাধু বলে যে কৃষ্ণচূড়া নামটি আমাদের কৃষ্ণের নামের সাথে মিলিয়ে রাখা হয়েছে। তখন মৌলভী বলে যে, এটি মোহাম্মদ চূড়া হলে ভাল হতো। এরপর হিন্দু সাধু একইভাবে কৃষ্ণনগর এবং গোপালগঞ্জ এর কথা উল্লেখ করলে মৌলভী বলল এই জায়গার নাম মোহাম্মদনগর এবং মোহাম্মদগঞ্জ হলে ভাল হতো। অত:পর সেখানে একটি রামছাগল আসার পর বিদেশী ভদ্রলোকটিও একই ভঙ্গিতে বলল,  রামছাগলের পরিবর্তে মোহাম্মদ ছাগলও রাখা যায়।”

quiet-freedom-of-expression

সিলেটের মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক আব্দুর রউফ খান কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘সাম্যবাদী’ কবিতার সারাংশ বুঝাতে গিয়ে ইসলাম ধর্মের কিছু বিষয় নিয়ে ব্যাঙ্গাত্বক মন্তব্য করায় তার বিরুদ্ধে কটূক্তির অভিযোগে স্কুল ছাড়া করা হয়। ২০১৩ সালে মুক্তমনা ফেইসবুক পেইজে লাইক দেওয়ায় বিজয় চন্দ্র ও পার্থ সারথি দাস পাপ্পু নামে দুজনকে গ্রেপ্তার ঘটনাটিও বহুল আলোচিত । ২০১৫ সালে ফেব্রুয়ারিতে মাইকেল হাসান নামের উপর এক ব্যক্তির উপর মামলা ও ফাঁসি চেয়ে আন্দোলন হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় ‘মাইকেল হাসান ফ্রম ইসলাম খ্রিস্টিয়ানারি’ শিরোনামে একটি ভিডিও ইউটিউবে প্রচার করে, যার মাঝে ইসলাম সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য ছিল। ২০১৪ এর জুলাই মাসে ফেসবুকের স্ট্যাটাস থেকে হবিগঞ্জ জেলায় কৃতান্ত দাস নামের আরও এক ব্যক্তিকে গ্রেফতারের ঘটনা হয়। পুলিশ কৃতান্তকে গ্রেপ্তার করতে গেলে স্থানীয় জনতা কৃতান্তকে পুলিশের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে গণধোলাই দিয়ে মেরে ফেলতে চায়, পুলিশের সাথে তাদের সংঘর্ষ বাধে। এ সময় পুলিশ ৩৭ রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে এবং কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়।

৩০শে মার্চ ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম জেলায় ফেসবুকে ধর্মীয় কটূক্তির অভিযোগে রায়হান রাহী আর উল্লাস দাসের ওপর শিবিরের লোকজন আক্রমণ করে এবং পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।  টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুরে নিখিল জোয়ারদার নামে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে কটূক্তির অভিযোগে ওঠে। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের বিক্রমপুর আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ইংরেজি প্রভাষক নির্মল কুমার রায়ের বিরুদ্ধে কটূক্তির অভিযোগে মামলা হয়। কুমিল্লার লাকসাম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক কৃষ্ণ চন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে কটূক্তির অভিযোগ উঠে ২০১২ সালে। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে বিজয় দিবসের নাটক মঞ্চস্থ করাকে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরা জেলায় কটূক্তির ঘটনাকে কেন্দ্র করে অসংখ্য হিন্দু বাড়িঘরে ভাঙচুর হয়, পরবর্তীতে শিক্ষিকা মিতা রানী বালাকে মোটরসাইকেলে করে বাড়ি থেকে তুলে এনে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। পীর ব্যবসায়ীদের মুখোশ উন্মোচন নিয়ে লেখা আবুল মনসুর আহমদের লেখা ‘হুজুর কেবলা’ গল্পটি মঞ্চস্থ করায় এই ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এমনকি নাটকে অংশ নেওয়ায় ছাত্রদেরও গ্রেপ্তার করা হয়। ভাঙচুরের পরিধি এতই বড় ছিল এই ঘটনায় দু’ হাজার লোককে আসামি শ্রেণীভুক্ত করে মামলা করা হয়েছিল। কটূক্তির অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার দেবাশীষ দয়াময় নামের এক শিক্ষক পুলিশের হাত গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখানের বিক্রমপুর আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের প্রভাষক নির্মল কুমার রায়ের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ঝিনাইদহ জেলার গড়াগঞ্জের মিয়া আলম ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক শিশির ফিরোজের বিরুদ্ধে কটূক্তির অভিযোগে মামলা হামলা ঘটনা শুনতে পাওয়া যায়। শিক্ষক শিশির ফিরোজের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি ক্লাস চলাকালে ‘ইনোসেন্স অব মুসলিম’ ছবিটির প্রশংসা করেছিলেন। মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখায উজেলায় প্রদীপ কুমার দাস নামে এক শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল কটূক্তির কারণে। জামালপুর জেলার সুপ্রিয় দে খাঁ নামের আরও শিক্ষিকার বিরুদ্ধে কটূক্তির অভিযোগে বহিষ্কারের ঘটনা ঘটে, পঞ্চম শ্রেণীতে পাঠদানের সময় তিনি বলেছিলেন, ‘ভূমিকম্প গজব টজব কিছু না, ভূমিকম্প হতেই পারে। আল্লাহ, ঈশ্বর ও ভগবান বলতে কিছু নেই।‘ হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী  কিশোর টেলিকমের মালিক শ্রীকান্ত দাশকে নিয়ে আপত্তিকর ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশের অভিযোগে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে ৩৪ রাউন্ড-বুলেট ছুড়তে হয়, আহত হয় দশ জন। বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জে মৃদুল নামের এক যুবকের বিরুদ্ধে কটূক্তির অভিযোগে মামলার দেখা মিলে। নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলাতেও ফেসবুক কেন্দ্র করে হৃদয় চন্দ্র সাহা এবং সুকান্ত চন্দ্র সাহার বিরুদ্ধে কটূক্তির অভিযোগ উঠে। তাদের মধ্যে হৃদয় চন্দ্র সাহাকে জেলে পাঠানো হলেও পালিয়ে যায় সুকান্ত চন্দ্র সাহা। ২০১৫ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ায় বরিশাল জেলায় বিএম কলেজে এক শিক্ষার্থীকে নাস্তিক আখ্যা দিয়ে তার বিচার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও তার কুশপুত্তলিকা দাহ করার ঘটনা হয়। ২০১৫ সালের আরেকটি ঘটনায় দেখা যায় ইসলাম ধর্মের নবী মুহাম্মদকে নিয়ে ফেসবুকে মন্তব্য করায় নিখিল রঞ্জন রায় (প্রিন্স) নামে এক ব্যক্তিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকার সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল। এছাড়াও কটূক্তির অভিযোগে ফার্মগেট  এলাকায় বাসে করে  যাওয়ার সময় এক ব্যক্তি গণধোলাই শিকার হয়েছিল। নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের লাইব্রেরিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে হাতে তুলে হয়। কটূক্তির অভিযোগে রংপুর জেলার মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. এ কে .এম. নুরুন্নবী লাইজু’র উপরে মামলা ও হামলা হয়। অধ্যাপক লাইজুর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি ক্লাস চলাকালে বলেছিলেন, “নবী তার পালক পুত্র জায়েদের স্ত্রীকেও বিয়ে করেছেন।” রাজধানীর ধানমণ্ডি সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক মদন মোহনকে লাঞ্ছিত করা হয়। তিনিও নবীর শেষ জীবনে অসংখ্য বিয়ে নিয়ে প্রশ্ন তুলছিলেন। গোপলগঞ্জ জেলায় টুঙ্গিপাড়ার জিটি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক শঙ্কর বিশ্বাস মণ্ডলও ধর্ম নিয়ে আলোচনার কারণে তোপের মুখে পড়েন এবং বহিষ্কার হন।  কুড়িগ্রাম জেলার রায়গঞ্জ ডিগ্রি কলেজের এইসএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্র গোপাল চন্দ্র দেবকে ২০১৪ সালের জুনে কটূক্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০১৫ সালে ফেসবুকে মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ফেনী পলিটেকনিক ইনস্ট্রিটিউট ছাত্র জুয়েল চন্দ্র শীলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে পুলিশ। চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়িতে ফেসবুকে আপত্তিকর ছবি আপলোড করে ধর্মীয় উস্কানির অপরাধে অভিযুক্ত কলেজ ছাত্র সুজন দেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল। ঢাকার নটরডেম কলেজের ছাত্র অং সিং মং মারমাকে খাগড়াছড়ি জেলা থেকে কটূক্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ২০১৩ সালে। নড়াইল জেলায় ইসলাম ধর্মকে কটাক্ষ করার অভিযোগ এনে শিক্ষক কিংকর চন্দ্র সমঝদারকে  ঘরছাড়া করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল, তিনি ক্লাসে বলেছিলেন ‘উপমহাদেশে ধর্ম নিয়ে গোঁড়ামী আছে’। এরপর শুরু হয় তাণ্ডবলীলা। যদিও যে ছাত্ররা অভিযোগ এনেছিল তারা বাংলাট্রিবিউন পত্রিকায় বলেছিল, “যেভাবে মিছিল সমাবেশে কিংকর স্যারকে জড়িয়ে বিভিন্ন রকম বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে এসব কথার কিছুই তিনি বলেননি। তার নামে ছাপানো পোস্টারেও যা কিছু বলা হচ্ছে সব বানানো ও মিথ্যা। এমন আলোচনা তিনি করেনই নি।“ এ.এম.এফ উচ্চ বিদ্যালয়ের জুনিয়র শিক্ষক বাবু নীহার চন্দ্র সূত্রধর ক্লাস নেওয়ার সময় কটূক্তির অভিযোগে হুমকির মুখে পড়েছিলেন। বোয়ালমারী জজ একাডেমির বিজ্ঞান শিক্ষক সমর বাগচী বিরুদ্ধেও কটূক্তির অভিযোগে মামলা হয়। এরপর থেকে তিনি অনেকদিন পলাতক ছিলেন। কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে শংকর চন্দ্র দাস নামে এক সেলুন দোকানদারকেও কটূক্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি ফেসবুকে একটি নাস্তিক পেইজে লাইক দিয়েছিলেন। ৭ নভেম্বর ২০১৫ সালে ফেসবুকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অপরাধে বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জ উপজেলায় স্বপন কুমার পোদ্দারের ছেলে চপল কুমার পোদ্দার  ও কলেজ রোডের আদর্শ পাড়ার মান্নান সিকদারের ছেলে মাঞ্জুরুল সিকদার পলাশ। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে মাগুরা জেলায় দীপু নামের নবম শ্রেণির স্কুলছাত্র গ্রেফতার হয়। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৫  সাতক্ষীরার শ্যামনগরে এনজিও পরিচালক মোহন কুমার  মণ্ডল ও শওকত গাজী গ্রেফতার হয়। পরিবেশ কর্মী মোহনকুমারের অপরাধ ছিল তিনি হজ্জ্ব নিয়ে ফেসবুকে বলেছিলেন যে, লোকে কেন শয়তানকে পাথর মারার জন্য এতদূরে যায়, সবার বাড়ির কাছে শয়তান আছে, তাকে পাথর মারতেও তো পারে।‘ এ কথার জন্য তাকে তথ্যপ্রযুক্তির ৫৭ ধারায় গ্রেফতার করা হয়।

images (1)

এর বাইরে আরো অসংখ্য ঘটনা আছে। পরিস্থিতি অনুধাবনের জন্য আশাকরি এ বেশি ঘটনা উল্লেখের দরকার নেই। এখন  যদি আমরা ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাবো কটুক্তির অভিযোগে হয়রানি ও গ্রেফতারের বেশিরভাগ ঘটনা ঘটেছে শিক্ষকদের উপরে। এ কথা বললে রেসিজম হবে না যে বেশিরভাগ গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে হিন্দু নামধারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে। বাক প্রকাশ তো দূরের কথা, কটুক্তির অভিযোগ করে কিছু ক্ষেত্রে এদের ফাঁসানো হয়েছে, কেউবা নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, গ্রেফতার হয়েছেন, কেউবা প্রতিবেশীদের তোপের মুখে টিকতে না পেরে এলাকা ছাড়া হয়েছেন। আমরা কিন্তু সব ঘটনা পত্রিকার পাতায় উঠে আসতে দেখি না। নীরব নিপীড়নের ঘটনাগুলো আমাদের জানাশোনার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের মানুষ এমনিতেই জানে না বাক স্বাধীনতা কি। কি তাদের কথা বলার অধিকার। কি বিষয়ে বলতে হবে। কি তাদের নাগপাশে বন্দী করে ফেলছে। এমনিতে সবক্ষেত্রে দুর্নীতির কারণে মানুষ ক্ষমতাসীনদের বিপক্ষে কিছু বলতে পারে না। কেননা ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য আছে একদিকে প্রশাসন, অন্যদিকে আছে তাদের পোষা গুণ্ডাবাহিনী। কেউ মুখ খুললেই আর রক্ষা নেই। হয়তো রাতের অন্ধকারে বা প্রকাশ্য দিবালোকে ঘাতকের ছুরির হাতে প্রাণ দিতে হবে। তাই আর কে কথা বলে। কে শোনে যারা ভাবতে শেখায় তাদের কথা। দৈনন্দিন রুটি রোজগার জোগাড় করতেই যাদের হিমশিম তাদের বাক স্বাধীনতা নিয়ে ভাবলে চলে না। কেননা তাদের বেঁচে থাকতে হবে, তাদের বেঁচ থাকতে হবে পরিবারের জন্য, পরিজনের জন্য। তাদের এ গরিবী, তাদের এ ভালমানুষীর সুযোগ নিয়ে দেশকে অন্ধকারাচ্ছন্ন রাখতে, চিন্তাশীল ও যারা ভাবতে পারে তাদের মুখ বন্ধ করার জন্য এখন বাংলাদেশে শুধুমাত্র লেখক ও আন্দোলন কর্মী হত্যা নয় কটুক্তির কারণে গ্রেফতার নির্যাতন ব্যাপক মাত্রায় পৌঁছেছে। যার কারণে বাক স্বাধীনতা চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। মানুষকে আতঙ্কের মাঝে রেখে আর যা হোক চিন্তার স্বাধীনতা দেয়া যায় না।

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s