নিজভূমে পরবাসীর গল্প

th (1)

হট্টগোলের শব্দে ঘুম ভেঙে যায় সুবর্ণার। ঘুম ভেঙে গিয়ে ভালই হয়েছে। খুব কষ্ট পাচ্ছিল সে স্বপ্নের মাঝে। আপ্রাণ বাঁচতে চাওয়ার নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার যে আকুতি সে অনুভূতি চিরন্তন। স্বপ্নে দেখা ঘটনা হয়তো মিথ্যা। কিন্তু কষ্ট বা সুখের অনুভূতিগুলো হয় সত্য। সত্য সবসময়ই সত্য। তাই হয়তো স্বপ্ন সত্য কিছু। কোন এক প্রতিজীবন বা জীবনের প্রতিবিম্ব।
সারা শরীর ঘেমে নেয়ে গেছে, হাঁসফাঁস করে। বিছানার চাদর এলোমেলো। পা তড়পেছে। যেন যন্ত্রণাগুলো পায়ের মধ্য থেকে বেরিয়ে যাবার চেষ্টা করছিল।
বাইরে এত চিৎকার চেঁচামেচি কেন? কি ঘটল আবার? অজানা আশঙ্কায় মন দুলে উঠল। আকাশ ঠিকমত পরিস্কার হয়নি। চোর আসেনি তো। সুবর্ণা বিছানা ছেড়ে লাইট জ্বালায়। জানালা-দরজার দিকে তাকায়। না ঠিকই তো আছে। টেবিলের ওপরে রাখা গ্লাস থেকে জল খায়।
দরজা খুলে বাইরে আসে। উঠোনে ওর মা, দাদা, বৌদি দাঁড়িয়ে। আর পাশের বাসার সুবল কাকু, তার ছেলে রণজিৎ। জোরে জোরে কথা বলছে। রাস্তার দিকে তাকায়। অনেক লোক আসছে যাচ্ছে। কেউ মারা গেল না তো?
সুবর্ণা দাদার দিকে তাকায় চোখে জিজ্ঞাসা নিয়ে।
ঘটনা শুনে সুবর্ণার চোখ ছানাবড়া। দুর্গা পুজার আর ক’দিন বাকী। পাড়ার মন্দিরে প্রতিমা বানানো হচ্ছিল। এই প্রথম কোন নারী পাল ওদের প্রতিমা বানাচ্ছে। পালের নাম রিংকু সরকার। কাজ প্রায় শেষ বললেই চলে। রঙের কাজ শুরু হবে।
রাতে কারা যেন মন্দিরের দরজা ভেঙে ঢুকে প্রতিমাগুলোর হাত-পা-মাথা কুপিয়ে ও ভেঙে গেছে। স্বরস্বতী, লক্ষ্মী, দুর্গার স্তন কুপিয়ে উঠিয়ে ফেলেছে। দুর্গার গলায় একটা আন্ডারপ্যান্ট ঝুলিয়ে রেখে গেছে। মন্দিরের ভেতর ঢোকা যায় না। দুর্বৃত্তরা যাবার সময় দল বেঁধে প্রতিমাগুলোর ওপরে প্রসাব করে গেছে। মন্দিরের প্রণামী বাক্সের টাকাও লুট করে গেছে।
ঘটনাটা কি কেউ দেখেনি। এলাকারই বাসিন্দা বয়স্ক সজ্জন ব্যক্তি বলে পরিচিত রহিম চাচা ফজরের নামাজ পড়ছিলেন তার বাড়িতে। তার বাড়ি মন্দির থেকে কাছে। তিনি ভাংচুরের শব্দ শুনে জানালা থেকে উঁকি মেরে দেখেন এ কা-। তাড়াতাড়ি নামাজ ছেড়ে উঠে মাথায় টুপি দিয়ে মন্দিরের সামনে হেঁটে এসে ওদের নিবৃত্ত করেন। নয়তো আরো ক্ষতি হত। হয়তো এ বছর দুর্গাপুজা আর হত না ওদের এলাকায়। পাল রিংকু সরকারও এসে গেছে। সে দেখে বলেছে ঠিক করা যাবে। হাতে এখনও ক’দিন বাকী। লোক নিয়ে দিনরাত খাটলে হয়ে যাবে।
সুবর্ণা মন্দিরের দিকে যাচ্ছিল। ওর দাদা বাঁধা দিল।
‘এখন যাস না।’
‘কেন? ওরা মায়ের ক্ষতি করে গেছে,আমি মাকে দেখতে যাব না?’
‘যাবি তো। দুপুরের পর যাস। এখন সাংবাদিক, পুলিশে ভরা।’
‘পুলিশ এসে কি করবে?’
‘কি আর করবে। ওরা তো কাউকে ধরবে না। ধরলেও ক’দিন জেল খেটে বেরিয়ে যাবে। বাংলাদেশে কি কোনদিন এসব কেসের বিচার হয়েছে?’
‘রহিম চাচা কিছু বলেছেন?’
‘তিনি প্রাণের ভয়ে সাক্ষী হতে চান না। ঘটনাটা তিনি আমাকে চুপিচুপি বলেছেন যে তিনি দেখেছেন। আর কাউকে বলেননি। বললে ঝামেলা আছে। তাকেও মেরে ফেলতে পারে। অহেতুক লোকটাকে বিপদে ফেলে লাভ কি?’

সকালটা খারাপ যাওয়া মানে দিনটাই খারাপ। তাই সুবর্ণা আজ আর কলেজে যাবে না ভাবে। কলেজের হোমওয়ার্কটা বসে বসে করে। বান্ধবী রূপাকে জানিয়ে আজ আর ও যাচ্ছে না। পাশের বাড়ির সুবল কাকুর বউ তার পুত্রবধু রানিকে নিয়ে আসে। রানির বিয়ে হয়েছে পাঁচ বছর। গোলমুখ, মিষ্টি চেহারা, বেঁটে। সংসারে কোন ঝামেলা নেই। রণজিৎ চাকুরি করে ভাল মাইনে পায়। কিন্তু ওদের কোন সন্তান হচ্ছে না। অনেকবার ডাক্তার দেখিয়েছে, পরীক্ষা করেছে, রিপোর্টে কোন সমস্যা নেই। তারপর কেন যে হচ্ছে না। রানিকে নিয়ে সুবল কাকুর বউ কোথায় কোন পীরের কাছে যাবে। আগেও একবার গিয়েছিল। সুবর্ণাকে এবার ওদের সঙ্গে যেতে বলেছিল। আজ বিকেলে যাবার কথা ছিল। কেননা সুবর্ণা প্রাইভেট পরায় একদিন পর একদিন। কিন্তু সুবর্ণা বাসায় আছে, কলেজে যাবে না দেখে ওরা মনস্থ করে হেমায়েতপুরী পীর সাহেবের কাছে সকালের দিকেই যাবে। সাড়ে দশটার দিকে ওরা সুবর্ণাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।
পীর সাহেবের বাড়ি অনেক দূর। জায়গাটার নাম রামপুর। রামপুর তো হিন্দুয়ানি নাম। রাম হিন্দুদের রাজার নাম। রামকে অনেকে দেবতাও মানে। এ জায়গাটার নাম হেমায়েতপুরী পীর সাহেব পাল্টাতে চেয়েছিলেন, এ নিয়ে অনেক চেষ্টা-তদবির করেছিলেন বিএনপি-জামাত সরকারের আমলে। পারেননি। তিনি রামপুর নাম বদলে রাখতে চেয়েছিলেন রহিমপুর। তাতে নাকি রামও থাকল, রহিমও থাকল।
এই হেমায়েতপুরি পীর স্বাধীনতাবিরোধী কুকর্ম করেছিলেন। অনেক সাক্ষ্য পাওয়া যায়। অথচ তাকে স্বাধীন দেশে সেনাশাসকের আমলে স্বাধীনতা পদক দেয়া হয়েছিল। তাহলে তিনি কি পদক পেয়েছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুুদ্ধে বিরোধিতার জন্য? তিনি যাদের ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন বলে শোনা যায় তা কি ছিল মিথ্যা?
আসলে এখন যে পীর সে হল আসল হেমায়েতপুরী পীর সাহেবের ছেলে। ছোট হুজুর। ছোট আব্বা। মুসলিমরা পিতাকে ‘আব্বা’ বলে। হিন্দুরা বলে ‘বাবা’। বাংলাদেশে এক সময় সবাই ‘বাবা’ বলত, এখন ‘আব্বা’ বলে।
তো পীর সাহেবের কাছে কি? তিনি কি জাদু জানেন? আধুনিক চিকিৎসা যেখানে সন্তান দিতে পারছে না তাদের সেখানে কি পীর সাহেব দোয়া কালাম আর পানি পড়া দিয়ে রানির পেটে বাচ্চা এনে দেবেন। কী কা-রে বাবা! এবার পীর সাহেবের বুজুরুকি ধরা পড়বে। এ বুজুরুকি ধরা পড়া দেখার জন্য সঙ্গে এসেছে সুবর্ণা।
প্রথমে রিক্সায় বাসস্টান্ড, তারপর বাসে চড়ে ত্রিশ কিলোমিটার, সেখান থেকে ভ্যানে চড়ে গ্রামের ভেতরের দিকে যেতে হয় আরো পাঁচ কিলো। মাথার ওপরে রোদ, গরমে নেয়ে যায় সুবর্ণা। মাটির রাস্তায় ধুলো। এবড়োখেবড়ো।
অনেক দূর থেকে তোরণ দেখা যায়। পীর সাহেবের আস্তানা। লোকালয় থেকে বেশ দূরে তিনি তার আস্তানা বানিয়েছেন। মূল দরজার সামনে ওদের ভ্যান দাঁড়িয়ে পড়ে।
ভেতরে ঢুকলে দেখা যায় দেয়াল ঘেরা সীমানার মাঝে কয়েকটা বিল্ডিং, এক পাশ থেকে অন্যপাশের দেয়াল দেখা যায় না, এলাকাটা এত বড়। বড় হবেও না কেন? প্রচুর টাকা আসে মুরিদদের কাছ থেকে। ভেতরেই অনেক দোকানপাট। খাবারের। জামাকাপড়ের। টুপির। ইসলামী বইয়ের। আতরের। গোলাপজলের। আগরবাতির। ফলের। যা যা লাগবে ভেতরেই আছে। বাইরে যাওয়া লাগবে না। ওরা হেঁটে হেঁটে মূল বিল্ডিংয়ের দিকে যায়। এটা পীরের বৈঠকখানা। এখানেই তিনি তার মুরিদদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন। সমস্যার সমাধান দেন। দেখা করেন। কত লোক নাকি এখানে এসে সমস্যার সমাধান পেয়েছে তার ইয়াত্তা নেই। কেউ নিঁখোজ হয়েছে, তার পরিবার এখানে এসে তার খোঁজ পেয়েছে, পীর বাবার বলেছেন সেই নিখোঁজ ব্যক্তি নাকি ভারতের কোন এক কালি মন্দিরে দেবীর সাধনা করছে। মানসিক বিকারগ্রস্ত ছেলেকে নিয়ে এসে এক বৃদ্ধ নাকি হাসতে হাসতে ফিরে গেছেন। তার ছেলে নাকি ভাল হয়ে গেছে। তিনি এখন প্রতি শুক্রবার আসেন, পীর সাহেবের সঙ্গে এক জামাতে নামাজ পড়েন। তার অন্য কোন চাওয়া নেই। যতদিন পীর বাবার টাচে থাকা যায়।
কারও নাকি অনেক বছর সন্তান হয়নি। সে নাকি এখানে এসে সন্তানসম্ভবা হয়ে ফিরে গেছে! এ কথা শুনে এখানে রানিরা এখানে এসেছে। আগেও দু’বার পীরবাবা রানিকে দেখেছেন। পানি পড়া খেতে দিয়েছেন। দোয়াদরুদ পড়ে ফুঁ দিয়েছেন। বলেছেন তৃতীয়বার আসলে রানি গর্ভ ধারণ করতে পারবে।
ভেতরে হাজিরা খাতায় নাম লিখিয়ে পীর বাবার মজলিসের দিকে যায়। চারটি বিল্ডিংয়ের মাঝে প্রশস্ত একটি জায়গা। মাথার ওপরে শামিয়ানা টাঙানো। মাটি নেই, কংক্রিট দিয়ে ঢালাই করা। তার ওপর অনেক চেয়ার বসানো হয়েছে। একে একে মাইকে নাম ধরে ডাকা হচ্ছে। পীরবাবা তার সঙ্গে কথা বলছেন। কাউকে পানি পড়া দিচ্ছেন। নারীপুরুষ নির্বিশেষে।
দুপুরের পরে রানির ডাক আসে। সুবর্ণা, রানির শাশুড়ি ও রানি চেয়ার থেকে উঠে স্টেজের দিকে যায়। রানির শাশুড়ি ও রানি ভাল করে শাড়ি টেনেটুনে ঠিক করে মাথায় শাড়ির ঘোমটা টেনে স্টেজে ওঠে। কোন এক লোক এসে ওদের ছবি তোলে। কেউ একজন পীরবাবার কানে কানে কিছু বলে। সুবর্ণাকে লোকটি স্টেজে উঠতে নিষেধ করে। পীরবাবা রানির সঙ্গে নিচু স্বরে কথা বলেন। তিনি রানির শাশুড়ির সঙ্গেও নিচু স্বরে কথা বলেন। সুবর্ণা ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে কী করবে। সে আবার চেয়ারে এসে বসে পড়ে। একজন যন্ত্রণাকাতর লোককে কেউ কোলে নিয়ে এসে মজলিসে ঢোকে। সবাই সেদিকে তাকায়। আবার ঘাড় ফিরিয়ে নেয়। পেটের যন্ত্রণা থেকে মুক্তির জন্য তাকে এখানে আনা হয়েছে। তাকে ডাক্তার ভাল করতে পারেনি, তাকে এবার পীর বাবা তার কেরামতিতে ভাল করে দেবেন নিশ্চয়ই।
রানির শাশুড়ি এসে সুবর্ণার পাশে চেয়ারে বসে।
‘রানি কোথায়?’ সুবর্ণা বলে।
যন্ত্রণাকাতর লোকটি পেট চেপে মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছিল, সেদিকে তাকিয়ে দেখছিল। তাই স্টেজের দিকে খেয়াল করতে পারেনি।
‘রানির আসতে আরও সময় লাগবে।’
‘কেন?’
‘বাবা তাকে পর্দাঘেরা ঘরে পাঠিয়েছেন। তাকে সেখানে কিছুক্ষণ থাকতে হবে। রানির সঙ্গে জ্বীনেরা দেখা করতে আসবে।’
‘কতক্ষণ লাগবে?’
‘পীরবাবা বলেছেন তার খাবারের পর রানি চলে যেতে পারবে। আজকের পর আসা লাগবে না।’ খুশিতে তার চোখমুখ ডগবগ। ‘আমিও জানতাম বাবা পারবেন।’
সুবর্ণা বিরক্তিতে চোখ ওল্টায়। এ মানুষগুলো এখনও কোন যুগে বাস করে কে জানে! এসব পীরেরা এদের ঠকিয়ে যাচ্ছে। আর বিশ্বাস এমন একটা বস্তু মানুষ এখানে এসে অন্ধ হয়ে যায়, আর কিছু ভাবতে চায় না। কোন যুক্তি নেই। মানুষ কি খোঁজে? সে আসলে স্বস্তি খোঁজে, সে নিজের ভাবনার মাঝে পরিতৃপ্তি চায়।
কিন্তু ঘটনা কি? সুবর্ণা মনে মনে ভাবে। রানির শাশুড়িকে ঝলমলে দেখাচ্ছে। তিনি এবার খুশি। এত খুশি গত পাঁচ বছরে হয়নি। সুবর্ণা বোঝে না কেন ঔরসজাত বাচ্চা লাগবে, দেশে কত গরীব অনাথ শিশু আছে। হিন্দু আশ্রমগুলোতে খোঁজ নিলেও পাওয়া যাবে। সেখানে থেকে কাউকে দত্তক নিলেই তো হয়। এই বাসযোগ্যতাহীন দেশে সংখ্যালঘু দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকের মত বেঁচে থেকে একটি নতুন শিশুকে পৃথিবীতে না আনলেই কি নয়। আমরা কি তাকে একটি সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দিতে পারছি?
পীরবাবার খাবার সময় হয়েছে। এখন অন্যরা যারা নিজেদের খাবার নিয়ে এসেছে তারা তাদের টিফিনবক্স, বিরানির প্যাকেট বের করে খাবার খাওয়া শুরু করে, কেউ হাত মুখ ধুতে কলের খোঁজে যায়। কেউ একটি মুরগি নিয়ে এসেছে পীরবাবাকে উপঢৌকন হিসেবে দেবে বলে সেটি ছুটে গেছে, দু’তিনজন লোক সে মুরগির পিছু ধাওয়া করছে আর মুরগিটি হাগতে হাগতে দৌড়–চ্ছে। ‘যদি তোকে ধরতে পারি তোরে একদিন কি আমার একদিন। তোরে আল্লাহু আকবর বলে জবাই দেব।’ মুরগি জবাই আল্লাহু আকবর বলে দিতে হয়, আল্লাহর নাম করে জবাই দিতে হয়। নয়তো সে মাংস হালাল হয় না। হিন্দুরা হারাম খায়।
সুবর্ণার গা কেমন জানি গুলিয়ে ওঠে। বমির দক ওঠে। কেন জানে না। গরম আর বোটকা ঘামের গন্ধ, তাছাড়া ধুলোবালি।
সুবর্ণার ইচ্ছে হল ওদিকে যাবে, পর্দাঘেরা ঘরে কি চলছে একটু উঁকি মেরে দেখি আসি। যেভাবা সেই কাজ। রানির শাশুড়িকে বাথরুমে যাবার কথা বলে চেয়ার থেকে ওঠে সুবর্র্ণা। চারদিক ভাল করে খেয়াল করে। বাথরুমের দিকে যায়। কি জঘন্য ওয়াসরুম। এখানে ওর মুতও আসবে না। এমনটা ভাবে। এমন ভাবনা কেন যে আসে। কিন্তু কি করা! এল যে! সে যা হোক! এবার ওয়াসরুম থেকে পর্দাঘেরা জ্বিনঘরের দিকে যাবার রাস্তা খোঁজে সুবর্ণা। এদিক থেকে যেতে হলে ছোট্ট একটি প্যাসেজ মতো পড়ে। যদিও একটু ঘুরে যেতে হবে। এখন প্যাসেজটাতে কাউকে দেখাও যাচ্ছে না। সুবর্ণা জুতো টিপে টিপে এগিয়ে চলে, যাতে শব্দ না হয়। জ্বিনঘরের কাছাকাছি আসলে কেমন একটা ফিসফাস, ধস্তাধস্তি, কোকানো ও চাপা ধমকের সুর শোনা যায়। ছোট্ট একটি খুপরি আছে সেখানে ফুটোতে চোখ রাখে সুবর্ণা। ও ধাক্কা খায় যেন ভেতরের দিকে তাকিয়ে। পেছন দিকে সরে আসে। নিজেকে সামলে আবার ফুটো দিয়ে তাকায়। জ্বিনঘরের মাঝে একটা বিছানা ছাড়া কিছু নেই। বিছানায় রানি উপরে চেপে বসে আসে পীরবাবা, পীরবাবা উলঙ্গ। এক হাতে রানির গলায় হাত ঠেসে ধরে আছেন, আর অন্যদিকে দুপা দিয়ে রানির কোমর জড়িয়ে ধওে রানির যোনির ভেতওে লিঙ্গ ঢুকিয়ে দিচ্ছেন লাঙলের মতো। এবার ফসল আসবে। অক্ষম স্বামীর পরিবর্তে পীরবাবার উদগ্র বীর্য রানির যোনিতে স্থান পেয়ে অবাধ ফসলের বান ডাকবে এবার। পীরবাবা চোখ মুদে বলছেন, ‘চিন্তা করিস না রে মনি, তোর পেটে স্বয়ং কৃষ্ণ আসবে রে?’
হাতমুখে জল দিয়ে সুবর্ণা রানির শাশুড়ির পাশে এসে বসে। কিছু বলে না। ওড়না দিয়ে মুখ মোছে। ওর তেষ্টা পেয়েছে। রানির শাশুড়ি জানতে চায় এতো দেরী কেন? কি যেন বলতে চায় সুবর্ণা। কিন্তু শব্দ বের হয় না, ব্যঙের মতো দুর্বোধ্য কিছু আওয়াজ ওঠে। সুবর্ণা নিজের কণ্ঠস্বর শুনে চমকে ওঠে। বোকার মতো এদিক ওদিক তাকায়।
এর আরো মিনিট পনের পরে রানি আসে। শাশুড়ির চোখেমুখে উদ্বেগ। কি হল? জ্বিন এসেছিল? কথা হয়েছে কিনা? রানি বলে সে জানে না। তবে পীরবাবা বলেছে আর কোন চিন্তা নেই। এর বেশি নাকি বলা যাবে না কাউকে।

th (4)

এরপরে ওরা আবার ভ্যানে করে রওয়ানা করে। ভ্যানে মোট চারজন। ওরা তিনজন আর আরো একটা চ্যাংড়া ছেলে, বয়স কুড়িও পেরোয়নি। ভ্যানচালক বেশ জোরেশোরে ভ্যান চালাচ্ছে। রানির শাশুড়ির মুখের দিকে অনেকদিনের পরে আজ একটু তাকানো যাচ্ছে, সে মুখে কেবল হাসি ছড়িয়ে পড়ছে মুক্তার মতো। রানি কিছুটা বা বিষণœ, কিন্তু পোশাক পরিপাটি, ক্লান্তিতে কিছুটা জিমোচ্ছে। আর সুবর্ণা দূরের দিকে তাকিয়ে ভাবছে এ পৃথিবীর কথা , মানুষের কথা। কত বৈচিত্র্য!
চ্যাংড়া ছেলেটাকে ভ্যানচালক বলছে, ‘ও মনু, তোমার কোরান খতম হইব কবে?’
‘এই তো আজ কোরান খতম করে এলাম।’ লাজুক হাসি ফুটে ওঠে ছেলেটার মুখে, কোরান খতমের তৃপ্তির হাসি।
‘তাইলে বাতাসা খাওয়াবা কবে?’
এবার সুবর্ণা তাকায় ছেলেটার মুখের দিকে। সে দ্যাখে যে কোরান খতম করা ছেলেটার মুখ শক্ত হয়ে এসেছে। তার চোখে কেমন যেন বন্যতা, ঘৃণার চাবুক।
সে বলে, ‘বাতাসা খাওয়ায় হিন্দুরা, আপনাকে জিলাপী খাওয়াবো চাচা।’

পীরবাবার ওখান থেকে এসে ঘটনাটা নিয়ে আর ভাবতে চায়নি। ভেবে ওর লাভ কি? রানি যা চেয়েছে, যেখানে রানির সম্মতি আছে সেখানে সে বাধা দেয় কি করে? নৈতিকতা, অনৈতিকতা এসব বিচার করা সব সময় সময়ের সাথে যায় না। হয়তো এতে রানির স্বামীরও সমর্থন আছে। মনটা অন্যদিকে সরিয়ে রাখার জন্য খাবার খেয়ে পেপার পড়তে শুরু করেছে। যত নেগেটিভ খবর আছে, সেসবে ভরে গেছে পাতা। দেখতে দেখতে নিজেকে বিকারগ্রস্ত মনে হয়। যেন প্রতিটি সংবাদপত্র আমাদের বিকারগ্রস্ততার এক একটি অকাট্য দলিল। খুন, ধর্ষণ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।
একটি খবর চোখে পড়ল। কোরান অবমাননার জন্য এক হিন্দু স্কুল শিক্ষক গ্রেফতার। খবরটি খুটিয়ে খুটিয়ে পড়ে, অবমাননা সম্পর্কে কোন কথা পাওয়া যায় না। বলা হয়েছে কটুক্তি করা হয়েছে। সে কটুক্তি যে কি তার বিবরণও নেই। একজনে বলেছে উনি কোরান সম্পর্কে কটুক্তি করেছেন, আর যায় কোথায় সকলে মিলে চড়থাপ্পড় দিয়ে কিলিয়ে ঘুষিয়ে পুলিশ ডেকে ধরিয়ে দেয়া। তার জান কবচ করা হয়নি যে এই বেশি। ধর্ম এমন এক মাদক যা মানুষের বিচারবোধকে নষ্ট করে ফেলে, শূন্য করে ফেলে, একসময় দেখা যায় বিচারবোধ বলে কিছু অবশিষ্ট নেই আর তার।
গত বছর আরেকটা ঘটনা শুনেছিল। কোথায় সৌদি আরবে হজ্জ হচ্ছে। সেখানে লোকে পিষ্ট হয়ে মারা গেছে। তা নিয়ে কে যেন ফেসবুকে লিখেছে দূরের শয়তানকে পাথর না মারতে না যেতে বাড়ির কাছের শয়তানটাকে দূর করো। ওয়াহাবীরা ছাড়া আর কেউ থাকবে না এ পৃথিবীতে। ইসলাম শান্তির ধর্ম। একমাত্র ইসলামীরাই শান্তিতে থাকবে। তাহলে অন্য কথা কি দাঁড়ায়? অন্যরা শান্তিতে থাকতে পারবে না। তাদের থাকতে হলে জিজিয়া কর দিতে হবে।
এসব আবুলগুলো ইউরোপে রিফিউজি হিসেবে ঢুকে, সেখানে রেপ করেছে, অত্যাধুনিক বেশভূষা আর পারফিউমের গন্ধ নাকি তাদের পাগল করে দিয়েছে। তাই দোষ সেসব নারীদের যারা বর্ষবরণের সময়ে রাস্তায় ক্ষীণ পোষাকে লোভ দেখিয়ে দেখিয়ে ঘুরেছে তাদের। এমনকি কোন এক পিতা যদি তার প্রাপ্তবয়স্কা কন্যার দিকে কামের তাড়নায় লোলুপ দৃষ্টিতে তাকান তাহলেও তা নাক জায়েজ। এমন ফতোয়া এসেছে। জর্জিয়ায় ষোল বছরের এক শরণার্থী আফগান কিশোর পঞ্চাশোর্ধ সে দেশের নাগরিক নারীকে ধর্ষণ করেছে।
এসব যে কি শুরু হয়েছে কে জানে! শুধু কি মুসলিমরা? ভারতে হিন্দুরাও বা কম কি? নিচু জাতের ছেলে ব্রাহ্মণের মেয়েকে বিয়ে করেছে কি তাকে খুন করা হয়েছে, নিচু জাতের এক ছেলে ব্রাহ্মণের বাড়ির দেয়ালে হাত রেখেছে তাকে ডেকে এনে তার হাত কেটে ফেলা হয়েছে। মুক্তবুদ্ধির চর্চার জন্য সেখানেও যুক্তিবাদীদেরও হত্যা করা হয়েছে।
এসব ভাবতে ভাবতে সুবর্ণা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। আর নিতে পারছিল না। একসময়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s