মালাউনের মেয়ে

খুব সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠে সুবর্ণা। ওদের বাড়ির পাশেই মসজিদ, আজানের বিকট শব্দে ওর ঘুম ভেঙে যায়। তারপরও মরার মতো শুয়ে থাকে, মুসল্লীদের পায়ের শব্দ পায়। ওর কেমন যেন ভয় ভয় করে। কিসের ভয়? ওর প্রায়ই পূর্ণিমার কথা মনে পড়ে। সে তো ২০০১ সালের কথা। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হেরেছিল। হিন্দুদের পাড়াগুলোতে হামলে পড়েছিল নরদানবেরা। পূর্ণিমা ছিল ছোট্ট এক বালিকা, তার মা ধর্ষণ করতে আসা মুসলিম যুবকদের ডেকে বলেছিল:‘বাবারা, আমার মেয়েটা ছোট, তোমরা এক এক করে আসো।’

purnima
ওরও তেমনি ভয় করে। যদি ওরকম কিছু হয়। আলো ফোটার পরে বিছানা ছেড়ে ওঠে। একা বাইরে বেরোয় না। মাকে ডাকে। মা ওঠে। তারপর ও ঘরের দরজা খোলে। দাঁত ব্রাশ করে। থালাবাটিগুলো ধোয়, কাঠের গুঁড়ি চুলোয় গাদিয়ে চাল বসিয়ে দেয় চুলোয়। মা তরকারিগুলো কোটেন। সুবর্ণা তরকারি রান্না করে। রান্না শেষ হলে মা-মেয়ে স্নান করে আসে। এবার ঠাকুর পুজোর পালা। দু’জনে জোকার দিয়ে সবে ঠাকুরকে ভোগের প্রসাদ দিতে বসেছে এই সময়ে টিনের চালে একের পর এক ইট পড়ার শব্দ। জানালার কাঁচেও এসে ইট পড়ে। কাঁচের কোণা এসে লাগে সুবর্ণার গালে, রক্ত বেয়ে পড়ে। ওর মা ওকে নিয়ে বিছানায় লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েন। ফ্লরে পড়ে থাকে দেবতাদের উদ্দেশ্যে নৈবেদ্য ও থালা।
এভাবে কতোক্ষণ কেটে গেছে কে জানে, ভীতির মধ্য থেকে যখন সময় মানুষের যায় তখন সে টের পায় না কী তার অভিব্যক্তি, তলোয়ার দিয়ে গলা দু’ফাঁক করা হয়েছে যেন। সুবর্ণা এক সময় লেপের মধ্য থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে পড়ে। ওর মা তখনও শুয়ে। চোখের পাশ থেকে গড়াচ্ছে অশ্রুকণা। সুবর্ণা মায়ের কপালে হাত রাখে, চুমু খায়, চোখের জল মুছিয়ে দেয়। তারপর ফ্লরে বসে ছোট ছোট থালাগুলো গুছিয়ে ঠাকুরাসনের দেব-দেবীদের মূর্তির সামনে রাখে, কৌটো থেকে চামচে বের করে চিনি দেয়, আর ছোট ছোট গ্লাস ভরা জল, লক্ষ্মীর কপালে সিঁদুরের রেখা আঁকে, ঠাকুরাসনের পর্দাটা সরিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ মন্ত্র জপে। এখন দেবতারা অন্নভোগ করবেন।
সুবর্ণা উঠে দাঁড়িয়ে জানালার কাছে যায়। গায়ের জোরে চিৎকার করে গালি দেয়:‘খাঙ্কির বাচ্চাআআ…।’
প্রায় প্রতিদিন সকালবেলা একই ঘটনা ঘটে। এরপর আর খাবার রুচি হয় না। তবুও মার জন্য খেতে হয় সুবর্ণাকে। মা-ও খেতে চায় না। তবুও বুঝিয়ে-সুজিয়ে মাকে খাইয়ে নিজেও দু’টো পেটে দিয়ে জামাকাপড় পাল্টে বেরিয়ে পড়ে।
সকাল এগারটার দিকে ওর কলেজ। বেশ কিছুটা পথ হাঁটতে হয়। মফস্বল শহরের কলেজ। পথে আসতে-যেতে ছেলেগুলোকে সে দেখে, ব্রীজের ঢালে দাঁড়িয়ে আছে। দূর পর্যন্ত একবার দেখে নেয়। রাস্তায় লোকজন আছে। সুবর্ণা বড় একটি নিশ্বাস নিয়ে আবার চলতে শুরু করে। ওগুলোর বেশ কয়েকটার আবার লম্বা দাড়ি। দাড়িগুলো দেখলেই ওর ঘেন্না লাগে। ওর এমনিতে যৌনকেশ না কাটলেই কেমন ঘিনঘিন করে। তার ওপর মুখের ওপর ওতগুলো দাড়ি নিয়ে ওরা কিভাবে যে ঘুমোয়, খায়। সূর্যের আলো ওদের গায়ে এসে পড়েছে। সে ছায়া রাস্তার ওপর। সুবর্ণা সে ছায়াগুলোকেও মাড়ায় না। দূর থেকে চলে যায়।
কথাটা ওর কানে আসে। ‘হিন্দু মেয়েটার লগে যদি প্রেম করতে পারতাম। আমার খুব শখ একটা হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করবো।’
সুবর্ণা সেদিকে তাকায় না। চুপচাপ হেঁটে চলে যায় কলেজের দিকে।
সুবর্ণাকে যতক্ষণ দেখা যায় ততক্ষণ ওরা রসালো আলাপ করে। ছেলেটার নাম ইসমাইল। মোবাইলে সানি লিওনের একটা পর্ণভিডিও চালায়।
‘সুবর্ণাকে বিয়ে করলে তোর বাপমা মানবে?’ জানতে চায় আলম।
‘মানবে না কেন? ঐ উছিলায় আমরা সবাই বেহেশতে যেতেও পারবো।’
‘তবে মালাউনের বাচ্চা মালাউন বেশি বাড়ছে। ওকে সাইজ করতে হইবো।’
ভাঙা মঠের ওপর থেকে ওপাশের শ্মশানের ধোঁয়া দেখা যায়।

ওদিকে সুবর্ণা কলেজে এসেছে। ক্লাসরুমে ঢুকে দেখে সাবিহা কোথায় বসা। জায়গাটা মেপে নেয় দ্রুত চোখ বুর্লিয়ে। সাবিহা ওকে পছন্দ করে না সুবর্ণা তা ভাল জানে। কারণ কি? কখনোই ওর সঙ্গে কিছুই কখনো হয়নি। কলেজের প্রথম দিন থেকে সাবিহা ওর সঙ্গে দূরত্ব রাখে। একবার কথা বলতেও গিয়েছিল যেচে। সাবিহা পালিয়ে যাবে না কি করবে বুঝতে পারছিল না, শেষে বোরখা পরা সাবিহা চিৎকার করে ওকে বলেছিল:‘তুমি আমাকে ছোঁবে না।’
হতভম্ব হয়েছিল সুবর্ণা। শুধুমাত্র হিন্দু বলে এমন ব্যবহার। সে আবার শিক্ষা নেবার জন্য কলেজে এসেছে। এর তো বাংলাদেশের কোন কওমি মাদ্রাসায় পড়া উচিত ছিল।
কিন্তু ওদিকে ব্যতিক্রমও আছে। এই যেমন রেখা। সেও মুসলিম পরিবারের মেয়ে। ওর সঙ্গে ভাল বন্ধুত্ব। ওরা একই টিচারের কাছে হিসাববিজ্ঞান পড়ে। ঘুরতে চায়। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে আড্ডা দেয়।
আজও গিয়ে রেখার পাশে গিয়েই বসে। রেখাও তো মুসলিম পরিবারের মেয়ে। কিন্তু সে তো সাবিহার মতো বিদ্বেষী নয়। ও যেন অচ্ছুত, ওর শরীর সাবিহার গায়ে লাগলেই যেন সাবিহা অপবিত্র হয়ে যাবে।

কলেজে দু’টো ক্লাস করে রেখা ও সুবর্ণা বেরিয়ে পড়ে। ওরা রেখার বাড়ি যায়। রেখার সঙ্গে কাল ঠিক করে রাখাই ছিল। অনুশীলনী থেকে হিসাববিজ্ঞানের কয়েকটি অঙ্ক বোঝেনি, গতকাল আলামিন স্যার, ওরা যার কাছে পড়ে, সুবর্ণা ঠিকঠাক বোঝেনি। রেখা আবার একাউন্টিং সাবজেক্টটা ভাল বোঝে।
অঙ্কগুলো বুঝে করতে করতে বেশ সময় লাগে। পয়তাল্লিশ মিনিট। দু’টো ফাইনাল একাউন্ট সমাধান করতে না করতেই তিনটে বেজে গেছে।
‘আজ তাহলে যাই।’ সুবর্ণা রেখাকে বলে।
‘সেকি?’
‘হ্যাঁ, অনেক বাজে। প্রায় তিনটে।’
‘চল। খেয়ে যা।’
‘নারে, বাসায় খাব।’
তবুও রেখা ছাড়তে চায় না। ওদিকে রেখার কাছ থেকে অঙ্কগুলো বুঝে নেয়ার সময় সুবর্ণা গরুর মাংস রান্নার গন্ধ পেয়েছিল। রেখার মা তখন রান্না করছিল। সেক্ষেত্রে আজ ওর রেখাদের বাড়িতে খাওয়া ঠিক হবে না।
রেখা আনমনে কি যেন ভাবছে দেখে রেখা হেসে ফেলল।
‘কিরে? তুই গরুর মাংসের কথা ভাবছিস?’
‘মা তোর জন্য মুরগির মাংসও রান্না করেছেন। খেয়ে যা। দুপুরবেলা আমাদের বাড়ি থেকে আমাদের চৌদ্দ পুরুষের আমলে কেউ না খেয়ে যায়নি। এটা আমাদের বাড়ির রেওয়াজ। তুই ভাল করে জানিস। আমরা খানদানি পরিবার। তোর জন্য আমাদের এ গর্ব নষ্ট হয়ে যাক তা তুই চাস?’
সুবর্ণা না করতে পারে না। ওর এমনিতে ক্ষুধাও লেগেছে খুব। হাতমুখ ধুয়ে টেবিলে বসে পড়ে।
রেখার মা দু’টো প্লেটে ভাত দিয়েছেন। রেখা ও সুবর্ণার জন্য।
‘কাকীমা, আপনি খাবেন না?’
‘খাবো তো। শোনো মামণি, তোমাকে একদিন বলেছিলাম, আমাকে কাকীমা বলবে না, চাচীমা বলবে। বেসিনে হাত ধুয়ে বসে পড়ো।’
সুবর্ণা কিছু বলে না। ও আড়চোখে দেখে টেবিলে গরুর মাংস আছে কিনা। হিন্দুধর্মে নাকি গরু খাওয়া নিষেধ। তাই এক টেবিলে খেতে বসে গরুর মাংস না রাখার ভদ্রতাটুকু আশাকরি তিনি দেখাবেন।
না। টেবিলে গরুর মাংস নেই। ও হাত ধোঁয়ার জন্য বেসিনের দিকে যায়। বেসিনে হাত ধুতে ধুতে রান্নাঘরে দিকে তাকিয়ে ও ভেতরে ভেতরে ধাক্কা খায়। গরু মাংসের দু’টো বাটিতে গরুর মাংস, আর ওর জন্য একটা বাটিতে মুরগির মাংস রাখা আছে। কাকীমা মুরগির বাটিতে গরুর মাংসের ডেকচি থেকে অল্প একটু ঝোল ঢাললেন।
সুবর্ণা হাত ধুয়ে টেবিলে আসে। ওর ভেতরে উথালপাথাল চলছে। রেখার মা এমন কিছু করবেন ও ভাবতে পারেনি। সে রেখার মা’কে বিশ্বাস করেছিল। আগে এমন কতদিন তিনি এমন খাইয়েছেন কে জানে। অদ্ভুত তো! এতেও কি তার ছোয়াব হবে?
রেখা আর সুবর্ণা টেবিলে বসে। রেখার মা হাত বাটি তিনটে নিয়ে এলেন। ডাইনিং টেবিলের পাশে চারটি চেয়ার। সুবর্ণার দু’পাশে রেখা ও তার মা বসা। রেখার পাতে ওর মা গরুর মাংস ঢেলে দিলেন। নিজের পাতেও ঢাললেন। সুবর্ণার পাত্রে গরুর ঝোল মিশ্রিত মুরগির মাংস ঢেলে দিলেন।
সুবর্ণার প্রচণ্ড বমির বেগ পেল। সে এক দৌড়ে বাথরুমে ঢুকে পড়ল।
বমি করে, বাথরুম থেকে বেরিয়ে সুবর্ণা জানালো ওর শরীর ভাল লাগছে না। ওর খেতে ইচ্ছে করছে না। রেখা ও রেখার মা অনেক জোরাজোরি করল। কিন্তু সুবর্ণা আর খেল না।

বাজারে ওদের ছোট একটা ওষুধের দোকান আছে। সেটা ওর বড় ভাই চালায়। খুব বেশি চলেও না। দোকানটার নাম জগৎবন্ধু মেডিসিন। ওর বাবার একসময় বেশ সুনাম ছিল। বাবা মারা যাবার পরে দাদা এল.এম.এফ পাশ করে বেশ কিছুদিন ভাল চালিয়েছে। অনেক লোকও আসতো। জগৎবন্ধুর হাতের দেয়া প্রেসক্রিপশন না পেলে কি হবে, তার ছেলে তো আছে। মানুষের মনে এমন একটা ভাবনা ছিল হয়তো। কিন্তু গত দশ বছরে আস্তে আস্তে পড়তির দিকে গেছে।
দোকান না চলার কারণ কি? দাদার কাছে অনেকবার জানতে চেয়েছে। দাদা বলতো না। ওকে উল্টো বকা-ঝকা করা হত ব্যবসাটাও ঠিকমত করতে পারে না দেখে। একদিন ওর দাদা একদিন বলল:‘বাজারে আল-মদিনা মেডিসিন খোলার পর থেকে এখন আর অধিকাংশ মুসলিমরা আমার দোকানে ওষুধ কিনতে আসে না।’ পাশাপাশি দোকান। অচেনা, পথচলতি কাস্টমারেরা দোকানের সামনে এসে সাইনবোর্ড দেখে, আমার দিকে কটমট করে তাকায়, তারপর আল-মদিনা মেডিসিনে ঢুকে পড়ে।’
বাসায় ফেরার পথে সুবর্ণা বাজারে রিক্সা থেকে নামে। দাদার দোকানে যায়। মায়ের জন্য ওষুধ নিয়ে আসে। দাদার সঙ্গে কথা হয় দু’একটা।
এখান থেকে বাড়ি বেশিদূরে না। হেঁটে হেঁটে বাড়ি চলে আসে।

বাড়ি ফিরে দেখে ছোটভাই রবিনের আবার মাথা ফেটেছে।
ছোটবেলায় ওদের মাথা ফাটতে ফাটতে মাথা থ্যাতা থ্যাতা হয়ে গেছে। প্রতি মাসে দু’বার করে ওদের ভাইবোনদের মাথা ফাটতো। হয়তো উঠোনে খেলছে, কোথা থেকে ঢিল এসে মাথায় পড়তো। ঢিলগুলো ছোঁড়া হত পড়শিদের কোন না কোন বাড়ির ছাদ থেকে।
আজকে আবার কি ঘটলো? ভাবছে সুবর্ণা। এখন তো ওরা বুঝতে শিখেছে। ওভাবে কেউ শত্রুতাবশত ঢিল ছুঁড়ে মারলে তাকে হয়তো রবিন দেখতে পেয়েছে। শত্রুতাও বা কি? ওদের সঙ্গে তো এলাকার কারো সঙ্গে বিশেষ কোন ঝগড়া নেই। শুধু ধর্মের ভিন্নতার কারণে ওরা অনেকটা একা হয়ে গেছে।
জখম তেমন গুরুতর কিছু নয়। ঘরে ব্যান্ডেজ ছিল। জায়গাটা স্যাভলন দিয়ে পরিস্কার করে ব্যান্ডেজ বেধে দিয়েছে মা।
‘বল এবার, কি হয়েছে?’
‘আমাকে মেরেছে শামীম। আমরা ক্রিকেট খেলছিলাম। প্রতিদিনই স্কুলের পরে ক্রিকেট খেলে বাসায় আসি। আমাকে ওরা একদিনও ইউকেট কিপিং করতে দেয় না। অথচ আমি উইকেট কিপার হিসেবে ভালো খেলি। বাউন্ডারিতে ফিল্ডিং করতে দেয়। বলও ভাল করি। একদিনও বল করতে দেয় না। ব্যাটিং আগে পেলে সবার শেষে খেলতে নামায়। বেশিরভাগ দিন দেখা যায় ব্যাটিং করতে নামার পরপরই অন্যজন আউট হয়ে যায়। আর ব্যাটিং পরে পেলে আমি নামার আগেই হয়তো ম্যাচ আমাদের দল জিতে যায়। অথবা লাস্ট ইউকেটে আমি নামলে ম্যাচ ডিক্লেয়ার দিয়ে ফেলে। আজ এর প্রতিবাদ করেছিলাম। কথা কাটাকাটি করলে আমার মাথায় স্ট্যাম্প দিয়ে বাড়ি মেরেছে দর্জিবাড়ির শামীম।’
‘কেউ কিছু বলেনি?’
‘না। অন্যরা দাঁড়িয়ে হাসছিল।’
‘তুমি আর ওদের সঙ্গে খেলতে যাবে না।’
‘আমি আর কারো সঙ্গে খেলতে যাবো না। আমি হিন্দু বলে ওরা আমার সঙ্গে এমন করে। হিন্দু হওয়া কি আমার পাপ? আমি কি ইচ্ছে করে হিন্দু হয়েছি।’ বলে কাঁদতে থাকে রবিন।
ঘরের বাতাস গুমোট হয়ে ওঠে। যেন কতদিন ধরে এ ঘরের দরজা বন্ধ আছে। সুবর্ণা কিছু বলে না। ওর ছোটভাই রবিনের কথাগুলো আজ কেমন যেন কঠোর শোনায়। কথাগুলোর ভেতরে অভিমানেরও বেশি জেদ আছে। করাতকলের শব্দের মতো। ভাইটার মাঝে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। একই সমাজে বাস করেও ওরা যে আলাদা, ওদের যে আলাদা করে রাখা হয়েছে তা রবিন আস্তে আস্তে বুঝতে শুরু করেছে।

সুবর্ণা দুপুরে খেয়েদেয়ে বিছানায় একটু গা এলায়। আজ কোচিং নেই। বিকেলে ওর একটা প্রাইভেট টিউশনি আছে। একটু চোখ লেগেছে ওর ছোটবোন পুজার প্রশ্নে ঘুম ভাঙলো। তারমানে সাড়ে চারটা বাজে। ওর স্কুল চারটায় শেষ হয়। ভাবল সুবর্ণা।
‘দিদি, লাল পিঁপড়া কি হিন্দু?’
শুনে কেঁপে ওঠে সুবর্ণা।
‘মানে?’
‘লাল পিঁপড়া কি হিন্দু, আর কালো পিঁপড়া কি মুসলিম?’
‘এ কথা তোমাকে কে বলেছে?’
‘আজ টিফিন আওয়ারে আমরা স্কুলের বারান্দায় বসে ছিলাম। এমন সময় আমাদের সঙ্গে বসা একটি মেয়ে লাল পিঁপড়াগুলোকে দেখিয়ে বলে ওগুলো হিন্দু পিঁপড়া। তখন সে পিঁপড়াগুলো পা পিঁষে মারে।’
নাহ! এগুলোর জ্বালায় আর থাকা যাচ্ছে না। লাল পিঁপড়া আর কালো পিঁপড়ার গল্প ওরাও শুনেছে আগে। তখন কেউ মারতো না। এখন লাল পিঁপড়া পায়ের নিচে পিঁষে মারায় এসেছে ঘটনা ঠেকেছে।
পুজা একটু সোজাসাপ্টা মেয়ে। তাই ওকে নিয়েই সুবর্ণার যত ভয়। জীবনকে বুঝতে ওর রবিনের থেকেও বেশি সময় লাগবে হয়তো। ও এখনো সংস্কৃতির মাঝে কিভাবে ইসলামকে চাউর করা হচ্ছে, বৈষম্য তৈরি করা হচ্ছে এসব বোঝে না।
‘এসব কথা যারা বলে তারা মূর্খ। অথবা জ্ঞানপাপী। মূর্খরা না জেনে কথা বলে, আর জ্ঞানপাপীরা জেনেশুনে মিথ্যে কথা বলে মানুষের মাঝে ভেদ তৈরি করে। এদের সঙ্গে কথা বলবে বুঝে শুনে, বেশি বলবে নাÑশুনবে।’

বিকেল পাঁচটার দিকে প্রাইভেট পড়াতে যায় সুবর্ণা। যে মেয়েটিকে পড়ায় ওর নাম হুমায়রা। হুমায়রার মা এর মাঝে একদিন বলছিল: জল একটি হিন্দু শব্দ। পড়ানোর সময় ‘জল’ পড়ানো যাবে না। সুবর্ণার মাথায় ঠিক কাজ করে না, ও বুঝতে পারে না কি পড়াবে। মেয়েটিকে সব সাবজেক্ট পড়ায়। স্কুলের পড়াটাও ঠিকঠাক করে কিনা দেখে, হোমওয়ার্কে সাহায্য করে। যেমন বাংলায় আছে: ‘ডুবে ডুবে জল খাওয়া’ মানে গোপনে কোন কাজ করা। সে ওটাকে পড়ায় ‘ডুবে ডুবে পানি খাওয়া’। ওরা পড়েছিল গণিতে, তিনটি ড্রামে যথাক্রমে ২২৫, ৩৭৫ ও ৫২৫ লিটার জল ধরে। সর্বাধিক জল ধরে এরূপ কলসি হলে শেষ ড্রামে কত কলসি জল ধরে? এই একই গণিতে হুমায়রাদের সময়ে এসে ‘পানি’ হয়ে গেছে। অথচ এরা জানে না ‘পানি’ শব্দটি সংস্কৃত শব্দ ‘পানীয়’ (যা পান করার যোগ্য) থেকে এসেছে। দিল্লীতেও ‘পানি’ শব্দের প্রচলন আছে। অথচ ‘জল’ শব্দটি বাংলা শব্দ। হিন্দুদের মুখে জল শুনে মুসলিমরা ‘জল’কে হিন্দুয়ানি শব্দ ভেবেছে। ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ সনেট কবিতার ক্ষেত্রে কি পড়াবে, ও বুঝতে পারে না। কবিতাটি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখা। কবিতার দু’পঙক্তি এরকম:‘বাংলার মাটি বাংলার জল/বাংলার বায়ু, বাংলার ফল/পূণ্য হউক, পূণ্য হউক, পূণ্য হউক হে ভগবান।’ তাই কবিতাটি বাদ দিয়েছে। কেননা এখানে জলের বদলে পানি আর ভগবানের বদলে আল্লাহ পড়ালে কবিতাটি বিকৃত হয়ে যাবে। তারচে’ কবিতাটি পাঠ্যতালিকা থেকে বাদ দেয়া ভাল। তাই কবিতাটি হুমায়রাকে পড়ায়নি সুবর্ণা।

হুমায়রাকে পড়িয়ে আজানের পরপর বাড়ি ফিরে আসে সুবর্ণা। ততক্ষণে নামাজ পড়ার আয়োজন চলছে। সকালের দিকে মাহফিলের স্টেজ বানানো চলছিল। রাস্তা জুড়ে মাদুর, হোগলা, পাটি বিছিয়ে ধর্মপ্রাণ লোকেরা তাদের বসার জায়গাতেই পশ্চিম দিকে মুখ করে নামাজ পড়তে দাঁড়াচ্ছে। রাস্তা বন্ধ। কোন রিক্সা বা গাড়ি যাওয়ার অবস্থা নেই। বাড়ির দিকে যেতে হলে সরু একটু জায়গা আছে। ওখান থেকেই যেতে হবে। অগত্যা কি আর করা। ওড়না মাথায় ও বুকে ভাল করে পেঁচিয়ে চোখ স্থির সামনে রেখে শূন্য অভিব্যক্তিহীন দৃষ্টিতে সুবর্ণা এগিয়ে যায়। মাহফিলে বসা অসংখ্য মাথা ওর দিকে ঘোরে। কারো কারো চোখ মুদে আসে সুবর্ণার শরীরের পারফিউমের গন্ধে। কয়েকশ’ চোখ ওর বুকে, ঠোঁটে, পাছায় ঘোরে। সে স্পর্শগুলো যেন টের পায় সুবর্ণা। সভ্যতার গভীর অন্ধকারে যেন হাজার হাজার সাপেদের নারকীয় সঙ্গম চলছে। ঐটুকু রাস্তা যেন অনন্ত যোজন পথ। কুকুরদের শৃঙ্গারের অন্তিম শব্দে ভরা।
ও বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে মাহফিল শুরু হয়ে যায়। বড় হুজুরের নাম মাইকে শোনা যায়। তিনি আজ ওয়াজ করবেন। ঘরে ঢুকে এক গ্লাস জল খায় সুবর্ণা। মা তখন সন্ধ্যাবাতি জ্বালছেন ওদের বাড়ির মাঝে পৈতৃক শ্মশানে। সেখান থেকে তিনি ঘরে এসে ভগবানের নাম জপ করতে করতে দুয়ারে জলের ছিটা দেন। পাঁজালে নারকেলের ছোবড়া সাজিয়ে আগুন জ্বালান, ধূপ দেন। পাঁজাল নিয়ে প্রতিটি ঘরগুলোতে ঘুরে বেড়ান। সুগন্ধী ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে সারা বাড়িতে। যেন সব অশুভ শক্তি এ ঘ্রাণে পালিয়ে যাবে। এরপর ঠাকুরাসনের কাছে এসে জোকার দেন। প্রতিদিন সন্ধ্যায় এ পাড়ায় হিন্দু বাড়িগুলোতে জোকার দেয়া হয়। অনেকের বাড়ির উঠোনে মন্দিরে বাড়ির সব নারীরা দল বেঁধে জোকার দেয়। সে স্বর হয় উচ্চ। কিন্তু তারা আজ জোকার দেয় অনেক ক্ষীণ স্বরে। যাতে রাস্তায় মাহফিলের স্থানে নামাজ পড়তে দাঁড়ানো লোকেদের কানে না পৌঁছায়।
ওদিকে নামাজ পড়া চলছে। এদিকে সুবর্ণা স্নানঘরে ঢোকে। উলঙ্গ হয়ে ঝর্ণার নিচে চোখ বন্ধ করে দাঁড়ায়। স্তন, গুঁড়ি গুঁড়ি কেশময় যোনি, হলদে পাখির রঙের লোভনীয় উরুদেশে হাত ঘঁষে ধোয়। এখনও কেউ ছোঁয়নি। এখনও কেউ চুম্বন করেনি। এখন কেউ পায়নি ওষ্ঠের গোপন স্বাদ, দুই পায়ের ঝিনুকের ফাঁকে একছত্র মাংসের গোপন কান্না কেউ শোনেনি।
গা মুছে, পোশাক পড়ে, স্নানঘর থেকে বেরিয়ে বিছানায় একটু বসে। মা এসে গরুর গরম দুধ আর দু’টুকরো রুটি দিয়ে যায়। মাইকের শব্দ খুব কানে বাজছে। ওয়াজের ফাঁকে ফাঁকে মাইকে বলা হচ্ছে কোন সামর্থ্যবান বান্দা কি আছেন যিনি অসমাপ্ত মসজিদের একটি জানালা, একটি দরজার ব্যয়ভার করবেন। একজনকে পাওয়া গেছে যিনি সৌদি আরব থেকে হজ্জ করে এসেছেন। আর কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। লোহার পাতের একটি জানালার দাম আর ক’টাকা? সাত হাজার বা আট হাজার। মাহফিলে আসা এত লোকের মাঝে কি কয়েকজনেরও এ সামর্থ্য নেই। আছে। আসলে তারা মাহফিলে এসেছে অশেষ নেকী হাসিলের জন্য। মাহফিলে এসে কর্ণকুহরে ওয়াজ ঢুকিয়েই তাদের নেকী হাসিল হয়ে গেছে। এখন আর মসজিদের জন্য আলাদা করে খরচ করার দরকার কি?
রবীন্দ্রনাথের নাম কানে যেতেই সুবর্ণা একটু সচেতন হল। কি বলছে মাইকে? রবীন্দ্রনাথ লিখেছিল:‘…তোমার পায়ে ঠেকাই মাথা।’ বলেন আস্তাগফিরুল্লাহ। এক আল্লাহ ছাড়া মুসলমান আর কারো পায়ে মাথা ঠেকায় না। বলেন ঠিক কিনা? ঠিক। ঠিক। সমস্বর ওঠে। ওদিকে দেখেন কবি কাজী নজরুল কী বলেছিলেন। নজরুল লিখেছিলেন:‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই/যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।/আমার গোরের পাশ দিয়ে ভাই নামাজীরা যাবে/পবিত্র সেই পায়ের ধ্বনি এ বান্দা শুনতে পাবে।’ বলেন সুবানাল্লা। রবীন্দ্রনাথ হল হিন্দুদের কবি, আর নজরুল হলো মুসলমানদের কবি। নজরুল আমাদের জাতীয় কবি। রবীন্দ্রনাথের লেখা কেন আমাদের জাতীয় সঙ্গীত হবে? জাতীয় কবিই তো জাতীয় সঙ্গীত লিখবে। কি কন আপনারা? ঠিক। ঠিক। ঠিক।
শুনে, সুবর্ণা কি ভাববে তাই খুঁজে পায় না। আজ আর পড়াশোনা হবে না। যদিও কাল কলেজের কিছু হোমওয়ার্ক ছিল। সকালে উঠে করা যাবে। দাদার দোকান থেকে আসতে দেরী হবে। বৌদি দাদার সঙ্গে খাবে। সুবর্ণা, পুজা, রবিন, ওদের মা একসঙ্গে রাতের খাবার খায়। মাহফিল শেষ হয়ে গেছে। লোকেরা তবারক নিয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। মাইকে আর কথা চলছে না। সুবর্ণা একটু স্বস্তি পায়। খেয়ে এসে নিজের ঘরে বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে। কিছুক্ষণ পরে মোবাইলটা বেজে ওঠে। কলকাতার ধর্মতলা থেকে ফোন এসেছে। ওর পিসিমার ফোন। ওদের ঠাকুরদার বাড়ি ও দিদিমার বাড়ির অনেকেই সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে গেছে। ওর বাবাও গিয়েছিল। কিন্তু পরে তিনি ফিরে এসেছিলেন। তার ভারত ভাল লাগেনি। দেশের প্রতি একটা টান ছিল। টান ছিল শেকড়ের প্রতি। টান ছিল মায়ের প্রতি। সুবর্ণার ঠাকুমা এখানের জমিজমা দেখাশোনার জন্য থেকে গিয়েছিলেন। তারপর আর ওর বাবা জগৎবন্ধু দাসের যাওয়া হল না। পরে এখানে তিনি সুবর্ণার মাকে বিয়ে করে থিতু হন। থেকে যান মাকে নিয়ে। কেননা মা স্বামীর ভিটা ছেড়ে যেতে চাচ্ছিলেন না। তাছাড়া সাত পুরুষের শ্মশানও তো এখানে। সুবর্ণার মা তার ছেলেমেয়েদের বারবার বলতেন তোরা ভারত চলে যা। এখানে তোদের কিছু হবে না। মেয়েগুলোকে কখন টেনে নিয়ে যায় মুসলমানেরা তার ঠিক নেই। একাত্তরের স্মৃতি এখনও ভুলতে পারেননি। ইসলাম রক্ষার নামে পাকিস্তানের অখ-তার নামে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এখানে হিন্দুদের বেছে বেছে খুন করা হয়েছিল। সেসময়ে রাস্তায় লোকেদের ধরে তাদের লুঙ্গি খুলে দেখা হত, খতনা করা কিনা। জগৎবন্ধু দাস বিপাকে পড়ে তখন খতনা করেছিলেন। শাহাদাৎ কলেমাও মুখস্থ করেছিলেন। একদিন পাকিস্তানী সৈন্যের সামনে পড়ে গেলে তার লুঙ্গি খুলে দেখা হল, শাহাদৎ কলেমা পড়ে জানে রক্ষা পেয়েছিলেন। কিন্তু পরে নিজের কাটা লিঙ্গের দিকে তাকিয়ে তার মনখারাপ হতো। শুধু একাত্তরের স্মৃতি কেন? এর আগে সাতচল্লিশে যে দাঙ্গা হল, তখনও কি ভয়ঙ্কর অবস্থা হয়েছে। নোয়াখালিতে, বরিশালে। বরিশালে এখনও কাশিপুরের ভেতরের দিকে মাইলের পর মাইল খালি জায়গা, গাছপালা ঘেরা বাগান, কিন্তু পুকুরগুলো গৃহস্থ পুকুরের মত। এরা সবাই চলে গেছে সাতচল্লিশের দাঙ্গার সময়ে । দাঙ্গাও বা কিভাবে বলি? দাঙ্গা কাকে বলে? যখন এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়ের ওপর হামলে পড়ে তাকে কি দাঙ্গা বলা যায়? বাংলাদেশে কখনো দাঙ্গা হয়নি। হিন্দুদের ওপর কট্টর মুসলিমরা সাতচল্লিশে হামলে পড়েছিল, উনিশশ’ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোয়ও পড়েছে, এমনকি স্বাধীনতার পরে আরো ভয়ঙ্কর দিন এসেছে। উনিশশ’ বিরানব্বই সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে এক রক্তাক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়। কতজন হিন্দু যে খুন তার ঠিক নেই, ধর্ষণ, বাড়িঘর পোড়ানো, মন্দির ভাঙাÑসেসব তো আছেই। দু’হাজার এক সালে নির্বাচনের পরে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী দল ও ইসলামিক একটি দলের জোট হিন্দুদের পাড়াগুলোতে হামলা করে। কেননা তারা মনে করে হিন্দুরা আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়। এভাবে করে করে হিন্দুদের তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তারা চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। ভারত তাদের আশ্রয় দিয়েছে, নাগরিকত্ব দিয়েছে।
কিন্তু মা যখন ভারতে চলে যাবার কথা বলত তখন সুবর্ণার মাথা গরম হয়ে যেত। ভাবত এদেশে জন্মগ্রহণ করেছি, আমি এদেশ ছেড়ে কেন যাবো। কিন্তু যত সে বড় হয়ে উঠেছে সে তত বুঝতে পেরেছে বাস্তবতা, তার বিশ্বাস টলে যেতে শুরু করেছে। আজকাল পিসিমা কলকাতা থেকে ফোন দিলে দেশের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন আর নানাভাবে বোঝাতে চেষ্টা করেন এখানে থেকে কিছু হবে না, তোরা চলে আয়।
সুবর্ণা তেমন কিছু বলে না। নিরুত্তর থাকে।
পিসিমার ছেলের বউয়ের সঙ্গে সুবর্ণা ফোনে তেমন কথা বলে না। একদিন সে বলে ফেলেছিল সুবর্ণাদের মতো যে হিন্দুরা এখনও বাংলাদেশে থাকে তারা মুসলমানদের সঙ্গে আপোস করে থাকে, দরকার হলে ওদের বাড়িতে গিয়ে গরু খায়, সেদিন তো সে নগ্ন ভাষায় বলেছিল সুবর্ণাকে, ‘তোরা তো ওদের হোলের নিচে থাকিস।’ সেই থেকে সুবর্ণা ওর সঙ্গে কথা বলে না। ওর ভাল লাগে না।
পিসিমার সঙ্গে ফোনে কথা শেষ করে দাঁত ব্রাশ করে সুবর্ণা মশারি টাঙিয়ে ঘুমোতে যায়। পাশেই একটা মেয়েদের হোস্টেল আছে। সেখানে পাহারাদার মাঝেমধ্যে হাঁক দেয়। হোস্টেলটা পুরনো বাড়িতে করা হয়েছে। বাড়িটা যিনি বানিয়েছিলেন অনেক বছর আগে তিনি এখানকার ডাকসাইটে উকিল ছিলেন। সাতচল্লিশ সালের দিকে সব সম্পদ ফেলে রেখে চলে গেছেন কলকাতায়। শোনা যায় কলকাতায়ও তিনি ওকালতি করে নাম করেছিলেন। বাড়িটা পরে সরকার নিয়ে নেয়। বেশ কয়েকটা সরকারি অফিসের হাত ঘুরে শেষ পর্যন্ত এখানে মেয়েদের একটি কলেজের ছাত্রীনিবাস বানানো হয়। নাম দেয়া হয় বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা নারী কবি সুফিয়া কামালের নামে। তাই কেউ আপত্তি করেনি। কিন্তু সুবর্ণা অন্যরকম করে ভাবে। চাইলে সরকার বাড়িটা যার বাড়ি সেই মনমোহন চাঁদ দাসের নামে ছাত্রীনিবাসটি করতে পারতো। কেউ সে প্রসঙ্গ তুলতে সাহস করেনি, সরকারও সৌজন্যতা দেখায়নি। এভাবে করে কৌশলে দেশের প্রথিতযশা সফল হিন্দু ব্যক্তিদের নাম মুছে দেয়া হয়েছে।
এসব ভাবতে ভাবতে সুবর্ণা ঘুমিয়ে পড়ে একসময়। ঘুমিয়েও শান্তি নেই। সেখানেও অপেক্ষা করে আছে দুঃস্বপ্ন। স্বপ্নে দেখে সকালবেলা কলেজের ড্রেসে ও রাস্তায় দৌড়–চ্ছে। পেছনে ধাওয়া করে আসছে রাস্তার পাশে সেই ছেলেগুলো। ওদের মুখ মে পান, হাত মে বিড়ি, মুখে শ্লোগান লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান। সুবর্ণা ছুটতে ছুটতে এক ব্রীজের ঢালে পড়ে গেল। সেই ছেলেগুলো এবার অর্ধেক মানুষ অর্ধেক ভালুকের রূপ পেল। ওরা ব্রীজের ঢালে ওকে মাটিতে শুইয়ে ওর ঠোঁটে চুম্বন করতে এল। বোটকা একটা গন্ধ। এক ধাক্কায় সবকটাকে ফেলে দিয়ে আবার দৌড়–চ্ছে। একটা মসজিদ সামনে পড়ল। এবার দুপুরবেলার মোলায়েম আভাটা চলে গিয়ে প্রখর রৌদ্রের দুপুর। সুবর্ণা মসজিদের সামনে দাঁড়াল। ভেতরে ঢুকতে যাবে, এমন সময় মসজিদের সামনে গাছের সঙ্গে সাইনবোর্ডে লেখা দেখল:‘মসজিদ চত্ত্বরে মহিলা ও গবাদি পশু ঢোকা নিষেধ।’ আবার সে দৌড়–তে শুরু করে। চিৎকার করে বাঁচাও। কাছেই অনেক লোক যাচ্ছে এদিকে পেছন করে। তারা কি বোবা, কানা, কালা? ওর চিৎকারের শব্দ কি ওদের কানে যাচ্ছে না? কোন বিকার দেখা যাচ্ছে না। ওকে তাড়া করা ছেলেগুলো অনেক কাছে চলে এসেছে। তারা বলছে:‘ কুত্তি মাগীটারে ধর। হিন্দু মেয়েদের পুটকিতে অনেক গন্ধ।’

 

###

মালাউন একটি জাতিবিদ্বেষমূলক গালি যা বাংলাদেশে মূলত: বাঙালি হিন্দুদের উদ্দেশ্য ব্যবহৃত হয়।

মালাউন শব্দটি আরবী শব্দ “ملعون” থেকে উদ্ভূত যার অর্থ অভিশপ্ত বা আল্লাহর অভিশাপপ্রাপ্ত।

 

###

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s