সব নারীর জন্য হিজাব আন্দোলন, অঞ্জলি দেবী হত্যা ও ড. আজিজুর রহমান

Untitled-4

ড. আজিজুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, তার ক্লাসে এক ছাত্রীকে নেকাব তোলার জন্য বলেছিলেন, কেননা সে কি জানতে চাচ্ছিল তার কথা বোঝা যাচ্ছিল না, তখন তিনি জানতে চান তার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্রে কি নেকাব পড়া ছবি ছিল কিনা, যদি না থাকে তাহলে তাকে সে চেহারায় অন্তত ক্লাসে বসতে হবে। তার বক্তব্য এমন আমি যাকে শিক্ষা দিচ্ছি তাকে যদি না দেখতে পাব তাহলে কিভাবে শিক্ষা দেব। এরপরও ছাত্রীটি রাজি না হলে তাকে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন। পরে অন্যান্য সহপাঠীদের অনুরোধে সে ছাত্রী ক্লাশ ত্যাগ করে। কিন্তু অন্য কোন ছাত্র পুরো ঘটনাটি মোবাইলে ভিডিও করে ও পরদিন ফেসবুকে আপলোড করে দেয় ‘সালাউদ্দিনের ঘোড়া’ নামের একটি পেজে এবং ফলোয়ারদের ড. আজিজুর রহমানকে ‘ইসলামবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে  হত্যার আহ্বান জানানো হয়। ফলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাকে মেরে ফেলার জন্য অনলাইনে উগ্রবাদীরা তার ব্যক্তিগত তথ্য যেমন তার ফেসবুক প্রোফাইল, ফোন নং ও ছবি  সহ কিভাবে ছুরি দ্বারা খুব সহজেই মানুষ হত্যা করা যায় ইউটিউব লিঙ্ক সহ আহ্বান জানাচ্ছে। এবং এজন্য ইভেন্টও খোলা হয়েছে। ৫৭ ধারা কি শুধুমাত্র তথাকথিত কটুক্তিকারীদের জন্য! সরকারকে তো এখানে ৫৭ ধারা প্রয়োগ করতে দেখলাম না! এরপর ড. আজিজুর রহমান নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে পুলিশি নিরাপত্তা চান, এখন তিনি চব্বিশ ঘন্টা অস্ত্রধারী পুলিশের প্রহরার মাঝে আছেন!

ড. আজিজুর রহমান একা নয় বেশ কিছু সংখ্যক প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সরকারের কাছে ইতোমধ্যে নিরাপত্তা চেয়েছেন, কেননা ২০১৩ সাল থেকে ভিন্নমতালম্বী ৩৪ ব্যক্তি চোরাগোপ্তা খুনের শিকার হয়েছেন বাংলাদেশে, যার মাঝে ১৫ জন রয়েছেন ব্লগার, লেখক, সম্পাদক, প্রকাশক, বিদেশী দাতা সংস্থার চাকুরে, সমকামী আন্দোলনের নেতা, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও এক্টিভিস্ট। এবং প্রতিটি হত্যার পরে মুসলিম উগ্রবাদী সংগঠনের পক্ষ থেকে দায় স্বীকার করে বিবৃতি দেয়া হয়েছে। এসব কারণে অনেক ব্লগার, লেখক, এক্টিভিস্ট, সংখ্যালঘু নেতা আত্মগোপনে চলে গেছে, যারা রাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তারা গানম্যান পেয়েছেন আর যারা যেভাবে পেরেছেন আমেরিকা বা ইউরোপের দেশগুলোতে চলে গেছেন। হত্যা ও আক্রমণের ঘটনা খোদ রাজধানীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশেপাশের এলাকায় ঘটেছে। যেমন ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে একুশে গ্রন্থমেলা থেকে বাড়ি ফেরার পথে আক্রমণের শিকার হন ও কিছুদিন পরে তিনি জার্মানীতে মারা যান। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতেও একরকম ঘটনা, একুশে গ্রন্থমেলা থেকে বাড়ি ফেরার পথে আমেরিকা প্রবাসী বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক অভিজিত রায়কে হত্যা করা হয় আর তার স্ত্রী ও সহলেখক বন্যা আহমেদকে কুপিয়ে মারাত্মক আহত করা হয়, তার হাতের আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ কারণে ড. আজিজুর রহমানকে নিয়ে আমাদের আশঙ্কা আছে যে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেও আক্রমণের শিকার হতে পারেন। আর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা কেন উগ্রবাদীরা এখন ঘরে ঢুকে কুপিয়ে ও ‍গুলি করে হত্যা করে যাচ্ছে। ২০১৫ সালের আগস্টে নিলয় চট্টোপাধ্যায়কে ‍কুপিয়ে হত্যা করে তারা ঘরে ঢুকে, আর এ বছরের ২৫ এপ্রিল সমকামী অধিকার আদায়ের পত্রিকার সম্পাদক জুলহাস মান্নান ও সমকামী অধিকারের কর্মী মাহমুদ রাব্বি তনয়কে তাদের বাসায় ঢুকে হত্যা করে।

ডা. আজিজুর রহমান, সাইকোলজির শিক্ষক। তাকে এখন চব্বিশ ঘন্টা পুলিশি নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে। ক্লাশের সময়ে বাইরে পুলিশী পাহারা থাকছে।  এবং তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষকদের জন্য নির্ধারিত যে বাড়িতে থাকেন সেখানেও পুলিশি পাহারা। তাছাড়া তার যাওয়া আসার পথের ধারে শাদা পোষাকধারী পুলিশও টহলে থাকছে।

ড. আজিজুর রহমানকে সাহসী বলতে হবে। তিনি এ পরিস্থিতিতেও তার অবস্থান ব্যক্ত করে স্পষ্ট দ্বর্থ্যহীন ভাষায় একটি ভিডিও বার্তা প্রচার করেছেন অনলাইনের মাধ্যমে।

লিঙ্ক—     https://www.youtube.com/watch?v=dGl8KlDWFss

Untitled-3

এসব যারা করছে স্বাধীনতাবিরোধী তারা, কেননা তিনি তাদের বিপক্ষে কথা বলেছেন, এ কারণে তারা তাকে শত্রু বলে চিহ্নিত করেছে অনেক আগে থেকে। কেননা যখন যুদ্ধাপরাধের বিচার ইস্যুতে সরকার ও যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থকরা মুখোমুখি অবস্থানে ছিল তখন ড. আজিজুর রহমান যুদ্ধাপরাধীদের বিরোধীতা করেছেন। কিন্তু এবার নেকাব ইস্যু সামনে আসায় তারা উঠেপড়ে লেগেছে। এবং একটি ঘৃণামূলক প্রচারণা চালাচ্ছে তার ভবিষ্যত হত্যাকে জায়েজ করার জন্য। এ ধরনের প্রচারণা কিন্তু অনলাইনে আমরা অভিজিত রায়ের হত্যাকাণ্ডের আগেও দেখেছি, কিংবা রাজীব হায়দার হত্যার পূর্বে উগ্রবাদীদের সমর্থক পত্রিকায় তার নামে মিথ্যা লেখা ছাপা হয়েছিল, কিন্তু তার হত্যার পরে প্রমাণিত হয়েছে সেসব লেখা তার ছিল না।

তাছাড়া যুদ্ধাপরাধী নেতা নিজামী ফাঁসি আপিল বিভাগ গত বৃহস্পতিবার বহাল রাখায় এখন তার ফাঁসি সময়ের ব্যাপার মাত্র। বিদেশে মানবাধিকার সংস্থাগুলো ফাঁসির সাজা কমাতে বলছে, পাশাপাশি তারা একে বিরোধী দলীয় নেতাদের ফাঁসি দেয়া হচ্ছে বলে প্রচার করছে। এ নিয়ে তার দল জামাত মরিয়া। কেননা তাদের সব শীর্ষ নেতা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত এবং অভিযুক্ত সকলের ফাঁসি হয়েছে, এখন নিজামীর ফাঁসি বাকি যিনি জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশের শিল্পমন্ত্রীও পরযন্ত ছিলেন। বছরে আড়াইশ মিলিয়ন টাকা মুনাফা করা বিভিন্ন সহযোগী সংস্থা মিলে দলটিকে তাদের মুনাফার ১০ ভাগ দল পরিচালনার জন্য দেয়। এ হিসেবে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামাত সবচে ধনী দল। তারা দেদার অর্থ খরচ করে, আন্তর্জাতিক লবিস্ট নিয়োগ করেও তাদের যুদ্ধাপরাধী নেতাদের বাঁচাতে পারছে না, আক্ষেপে ও পুলিশী ধরপাকড়ে দলটির সব নেতা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছে। এবং সেখান থেকে বেরিয়ে এসে নাশকতা চালাচ্ছে। এমনকি দলটির ছাত্র সংগঠন শিবিরের অনেক কর্মী নিষিদ্ধঘোষিত উগ্রবাদীদের দলে যোগ দিয়েছে বলে গোয়েন্দাদের কাছে ধৃত জঙ্গীরা স্বীকার করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা হত্যার হুমকি নতুন পাচ্ছেন তা নয়। এর আগেও অনেক শিক্ষককে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। কোনো হুমকি দেয়া হয়েছে বেনামে, কোনো হুমকি দেয়া হয়েছে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের নামে। কিন্তু একজন শিক্ষককে হত্যার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওপেন ডিসকাশন এই প্রথম! এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত আইনপ্রয়োগকারী সংস্খাও নিরব। তাছাড়া ২০১৩ সাল থেকে ভিন্ন মত দমনের জন্য যে টার্গেট কিলিং চলছে তা নিয়ে সরকারের যেন কোন মাথা ব্যথা নেই। শুধুমাত্র একটি হত্যা, স্থপতি ও ব্লগার রাজীব হায়দার হত্যার বিচার হয়েছে, কিন্তু সে বিচার আশাব্যঞ্জক নয়, একঅর্থে নির্দেশদাতা জসিমউদ্দিন রাহমানীর মাত্র পাঁচ বছরের জেল হয়েছে সঠিকভাবে প্রমাণ দাখিল না করায়। এবং সবকটি হত্যায় চাপাতি ব্যবহার করা হয়েছে। কোন কোন হত্যায় আগ্নেয়াস্ত্র ও বাহন হিসেবে মটর সাইকেল ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেকগুলো হত্যায় আইএস বা আল কায়েদা বা আনছার আল ইসলাম দায় স্বীকার করলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন তারা আইএস বা আল কায়েদা বা আনছার আল ইসলাম খুঁজে পাচ্ছে না। অথচ এ মাসের প্রথমে সিঙ্গাপুরে আট বাংলাদেশী ধরা পড়ে একটি হিটলিস্ট সহ, যারা দেশে ফিরে বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষদের খুন করার প্লান করছিল এবং তাদের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গী সংগঠন আইএস এর সঙ্গে যোগসূত্র আছে ।

২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের নার্সিং কলেজের হিন্দু শিক্ষিকাকে দিনের আলোয় চকবাজারের মতো জনবহুল এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয়, তার অপরাধ ছিল নার্সেদের জন্য হিজাবের বিরোধীতা করা। সেসময় ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামাত এর ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির ‘সব নার্সেদের জন্য হিজাব’ নামে একটি ক্যাম্পেইনের প্রচারণা চালাচ্ছিল। অঞ্জলি দেবী নার্সিং কলেজের উদ্দেশ্যে সকাল সাড়ে আটটার দিকে বাসা থেকে বেরিয়ে যান, এবং স্বামী ডা. রাজেন্দ্র চৌধুরীর কাছে পনের মিনিটের মধ্যে খবর আসে তার স্ত্রীকে কিছু তরুণ কুপিয়েছে। জায়গাটি ছিল বাড়ি থেকে মাত্র ত্রিশ/চল্লিশ গজ দূরে। ডা. রাজেন্দ্র গিয়ে দেখতে পান তার স্ত্রী রক্তের মাঝে মুখ থুবড়ে আছেন, তিনি তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। তাকে হত্যার কারণ হিসেবে তার ছাত্রীরা জানায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে জামাত শিবির নার্সিং শিক্ষার্থীদের হিজাব ও বোরখা পড়ার জন্য ক্যাম্পেইন চালায়, এ ক্যাম্পেইনে শিক্ষিকা অঞ্জলি দেবী বাধা দেন এবং ছাত্রশিবির একে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে, তারা হুমকি দিলে ক্রমে ৯০ ভাগ মুসলিম শিক্ষার্থী হিজাব ও বোরখা পরা শুরু করে। অন্যদিকে অঞ্জলি দেবীকে একের পর এক হুমকি পান। অঞ্জলি দেবী তার ছাত্রীদের মহিয়সী সেবিকা ফ্লোরেন্স নাইটএঙ্গেলের আদর্শে অনুপ্রাণিত করতেন, তার মত হতে বলতেন, কিন্তু উগ্রবাদীরা তাকে ‘আয়শা বিনতে আবু বকর’ অথবা ‘খাদিজা বিনতে খালিদ’ এর আদর্শে তার ছাত্রীদের গড়ে তুলতে বলেছিল  যাতে তারা মুসলিম উম্মাহর জন্য কাজ করতে পারে। এরপর তাকে ইসলামবিরোধী  হিসেবে আখ্যা দেয়া হয় ও তাকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করা হয়।

লিঙ্ক– https://hinduexistence.org/2015/01/11/anti-hijab-nursing-teacher-hacked-by-islamists-in-bangladesh/

গত ২৩ এপ্রিল (২০১৬) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যায়ের শিক্ষক রেজাউল সিদ্দিককে হত্যা করা হয়েছে। এ নিয়ে গত চার বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গুপ্তহত্যার শিকার হওয়া শিক্ষকের সংখ্যা চারজন।

সব মিলিয়ে ড. আজিজুর রহমানকে নিয়ে আমাদের উদ্বিগ্ন হবার কারণ আছে। বারবার একাধিক সংগঠনের নামে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দায় স্বীকার করে হত্যাকারীরা নিজেদের বায়বীয় করে তুলছে। আমরা যদি চট্টগ্রামের অঞ্জলি দেবী হত্যার দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো ‘সব নার্সেদের জন্য হিজাব’ আন্দোলন এর পেছনে কারা ছিল, তারাই সে সংগঠনই এখন ড. আজিজুর রহমানের পেছনে লেগেছে, তাকে কতল তালিকায় ফেলে দিতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে।

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s