মসজিদের মাইকের অপব্যবহার ও বাংলাদেশে সংঘাত

 

b7f835ec20d84d5b2575947009b2da00 (2).jpg

ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী, ঢাকাকে মসজিদের শহর বলা হয়। ২০১৬ এর জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশের স্বনামধন্য পত্রিকা দৈনিক ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন ঢাকায় এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ’ঢাকা শহরে মসজিদের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে এবং একই সময়ে একই স্থানে উচ্চস্বরে মাইকে আযান প্রচার হওয়ায় শব্দদূষণ হচ্ছে। তাছাড়া ওরশের নামে এখন ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে রাতভর ওরশ শরীফ-ওয়াজ মাহফিল হচ্ছে মাইক বসিয়ে—এতে করে শব্দদূষণের পাশাপাশি স্বাভাবিক জীবনযাপনও কঠিন হয়ে পড়েছে।’ এর জের ধরে দেশে তখন ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। মসজিদে মসজিদে জুমার নামাজের খুতবাগুলোতে তাসমিমা হোসেনকে বেশ্যা, নাজায়েজ সন্তান/বেজন্মা ইত্যাদি বলা হয়। কোথাও কোথাও ইঙ্গিতে তাসমিমা হোসেনকে কতলের আহব্বান জানানো হয়, উদাহরণ দেয়া হয় কিভাবে ইসলামের বিজয়ের সময়ে বিরোধীদের হত্যা করা হয়েছিল। উল্লেখ্য যে  ব্লগার রাজীব হায়দার হত্যাকাণ্ডে জড়িত আসামীদের স্বীকারোক্তিতে উঠে এসেছে যে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসিম উদ্দিন রাহমানীর ওয়াজ ও খুতবা শুনে হত্যাকারীরা উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। অথচ রাজীব হায়দার হত্যার বিচারে জসিম উদ্দিন রাহমানীর মাত্র পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয়। পৃথিবীতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মামলা খতিয়ে দেখলে বোঝা যায় যে পরিকল্পনাকারীর বা মাস্টারমাইন্ড এর সাধারণত সর্বোচ্চ সাজা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এ মামলার ক্ষেত্রে তা হয়নি। যা হোক সে অন্য বিষয়, এ লেখার মূল বিষয় মসজিদের মাইকের অপব্যবহার ও বাংলাদেশে সংঘাত। উল্লেখ্য যে মসজিদের মাইক নিয়ে প্রকাশ্যে শব্দদূষণের এ অভিযোগ এই প্রথম, কেননা বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে ধর্ম সংক্রান্ত হওয়ায় সাহস করে তাসমিমা হোসেনের আগে কেউ এ কথা বলেননি! উল্লেখ্য যে ইসলামের শেষ নবী মুহম্মদের সময়ে মাইকের কোন প্রচলন ছিল না।

মসজিদ এবং মন্দিরের সৃষ্ট উচ্চ শব্দ বন্ধ করতে ২০১৫ সালে সন্তোষ পাচলাগ নামে ভারতের মুম্বাইয়ের এক বাসিন্দা আদালতে একটি পিটিশন দায়ের করেন। এরপর একই বছর সেপ্টেম্বর মাসে হাইকোর্ট থেকে এক যুগান্তকারী রায় দেয়া হয়, আদালত তার সিদ্ধান্তে জনবহুল এলাকাতে রাত ১০ টা থেকে সকাল ছয় টা পর্যন্ত মাইকে উচ্চ শব্দ করার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পিটিশন করার সময় ৪৯ টি মসজিদের মধ্যে ৪৫ টি মসজিদই উচ্চ শব্দ করতো। ওই এলাকার পুলিশের ডেপুটি কমিশনার মুসলিম ‘একতা ফাউন্ডেশন’ নামে একটি স্থানীয় সামাজিক সংগঠনের সদস্যদের নিয়ে একটি আলোচনার আয়োজন করেন। সেখানে মুসলিম ধর্মালম্বী সদস্যরা আদালতের ঘোষণায় একাত্মতা ঘোষণা করেন। অনুমতিবিহীনভাবে মসজিদ এবং মন্দির নির্মাণ করায় পাঁচটি মসজিদ এবং দুটি মন্দিরের মাইক নামিয়ে দেয় পুলিশ। তবে পুলিশ জানায় মন্দিরগুলো তাদের বিশেষ অনুষ্ঠানের সময় অনুমতি সাপেক্ষে ১২টা পর্যন্ত মাইক ব্যবহার করতে পারবে। শব্দদূষণ বন্ধে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এক আদেশের ভিত্তিতে এ রায় দেয়া হয়,  ডিভিশনের প্রধান বিচারপতি এ সময়ে শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছেন ৭৫ ডেসিবেল। পুলিশ মনে করছে এ তাদের এ পদক্ষেপের ফলে আজান ও ভজনের কারণে যারা দেরিতে ঘুমোতে যেতে বাধ্য হতো তাদের মুক্তি দেবে। এ পদক্ষেপ শব্দ দূষণ থেকে এলাকাবাসীকে অনেকটাই মুক্তি দেবে বলে আশা করছেন তারা। এ ধরনের কোন রায় বাংলাদেশের আদালত থেকে আসতে পারে তা এখনও সুদূর কল্পনা।

মসজিদের মাইক ব্যবহারে কিছু নিয়ম আছে। যেমন—১। মসজিদের মাইক দ্বারা আযান-ইকামত, বয়ান, তাফসীর ইত্যাদির কাজ করা জায়েজ। মসজিদের মাইকে মৃত ব্যক্তির খবর প্রচার এবং আরো বিভিন্ন দুনিয়াবী কাজে এ‘লান করা হয়, এগুলো ঠিক নয়।

(সূত্র–হিন্দিয়া-২/৪৫৯, আহসানুল ফাতাওয়া-৬/৪৪৬, রহীমিয়া-৬/১০৬)

২। মসজিদের মাইক দ্বারা অনেক স্থানে শেষ রাত্রে যিকির করা হয় বা গযল পড়া হয় বা তিলাওয়াত করা হয়। এসবই নাজায়িয। কারণে এতে লোকদের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে এবং ইবাদাতকারীদের সমস্যা সৃষ্টি হয়। তাছাড়া অনেক স্থানে ইশার পর গভীর রাত পর্যন্ত মাইকে গযল, কিরাত পড়া হয়। এটাও নিষেধ।

(সূত্র–বুখারী শরীফ হাদীস নং ৬০১৮, যিকর ও ফিকর-২৫,মাহমূদিয়া-১৮/১৩৩)

কিন্তু বাংলাদেশে এখন মসজিদের মাইকের অপব্যবহার হচ্ছে, এমনকি এর দ্বারা সংঘাত উসকে দেয়া হচ্ছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এ বছর (২০১৬ সালে) ১৩ মে বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জে ‘ধর্ম নিয়ে কটুক্তির’ অভিযোগে স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে মারধর ও কান ধরে ওঠবস করানো হয়। শ্যামল কান্তি ভক্ত একজন হিন্দু সংখ্যালঘু। ’ধর্ম নিয়ে কটুক্তির’ কথিত অভিযোগটি আসে স্কুল সংলগ্ন মসজিদ থেকে, স্থানীয় জণগণকে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে শ্যামল কান্তি ভক্তকে শাস্তি দেয়ার আহ্বান দেয়া হয় সে ঘোষণায়। শ্যামল কান্তি ভক্তকে চাকুরী থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। হেফাজতে ইসলাম নামের ধর্মভিত্তিক উগ্রবাদী দলটির সদস্যরা সংখ্যালঘু প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তের ফাঁসির দাবীতে রাস্তায় নেমে আসে, তারা স্থানীয় ডিশ চ্যানেলের মাধ্যমে সকলকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানায়। পরে তদন্তে দেখা যায় শ্যামল কান্তি ভক্ত এ বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, এ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে এ ঘটনা ঘটে, শ্যামল কান্তি ভক্ত আদৌ ধর্ম নিয়ে কোন মন্তব্য করেননি। শ্যামল কান্তি ভক্তকে প্রধান শিক্ষক পদে পুনর্বহাল ও বিদ্যালয়টির পরিচালনা কমিটি ভেঙে দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শ্যামল কান্তি ভক্তের রক্ষা পাওয়ার পেছনে মিডিয়ার আশির্বাদ ছিল, তারা গুরুত্বের সঙ্গে খবরটি প্রচার করায় শ্যামল কান্তি ভক্ত এ যাত্রা রক্ষা পান। কিন্তু তার জীবনাশঙ্কা আছে এখনও। কেননা গত ৩০ শে এপ্রিল ২০১৬ বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলায় নিখিল চন্দ্র জোয়ারদারের নামে যে পঞ্চাশ বছর বয়স্ক হিন্দু সংখ্যালঘু দর্জিকে হত্যা করা হয় এবং সে হত্যার ঘটনায় পরে জঙ্গীগোষ্ঠী আইএস দায় স্বীকার করে বলে জানায় আমেরিকার সাইট ইন্টারলিজেন্স গ্রুপ, সে নিখিল চন্দ্র জোয়ারদারের নামে ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটুক্তির একটি পুরনো মামলা হয়েছিল, তখন গ্রেফতার হন নিখিল চন্দ্র জোয়ারদার, কিন্তু পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অনুরোধে মামলাকারী সে মামলা তুলে নেয় এবং নিখিল চন্দ্র জোয়ারদার জেল থেকে বেরিয়ে আসেন। ধর্ম নিয়ে কটুক্তির সে পুরনো অভিযোগের কারণে পরে তাকে হত্যার ঘটনা ঘটে।

মাইকের অপব্যবহার ও সংঘাত নিয়ে আরো কিছু ঘটনার উল্লেখ করছি। ২০১৩ সালের মার্চ মাস থেকে যখন বর্তমান সরকারবিরোধী দলগুলোর সংঘাত, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবীতে রাজপথে গণজাগরণ মঞ্চের একটানা অবস্থান, প্রশাসনের কঠোর মনোভাব—এ ত্রিমুখী সংঘাত-সংঘর্ষের সৃষ্টি হলে দেশকে সংকটের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল সেসময় জামায়াত ইসলামের নেতা ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে বলে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার মসজিদের মাইক থেকে গভীর রাতে ঘোষণা দেওয়া হয়, এবং সকলকে বাইরে আসতে বলা হয়, সহজ সরল মানুষেরা রাস্তায় নেমে এলে তাদের দিয়ে সরকার বিরোধী ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে কারাবন্দী যুদ্ধাপরাধী দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ‍মুক্তির দাবীতে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে বিদ্রোহে উসকে দেয়া হয়, মিছিল করানো হয়, পুলিশ গুলি ছুঁড়ে সে বিদ্রোহ দমন করে, পরিপ্রেক্ষিতে অনেক মানুষ মারা যায়। এছাড়া একই বছর মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে খুলনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, মানিকগঞ্জ জেলাসহ আরো অনেক জেলায় পুলিশের বিপক্ষে সংঘাতে লিপ্ত হয় বিএনপি ও জামাতের সংঘবদ্ধ চক্র। একই রকম ঘটনা দেখা গেছে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবের সময়ে আয়াতুল্লাহ খোমেনিকে চাঁদে দেখা গেছে বলে মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা দেয়া হয়। বাংলাদেশের মসজিদের মাইকের অপব্যবহারের এটি একটি বড় ধরনের ও স্পর্শকাতর ঘটনা। যতদূর জানা যায় কারাবন্দী দেলোয়ার হোসেন সাঈদী এ ঘটনা শুনে নিজেও দ্বিমত প্রকাশ করেছিলেন, এবং এ ধরনের গুজব না ছড়ানোর জন্য তার রাজনৈতিক দল জামায়াত নেতাদের প্রতি মুক্ত আহ্বান জানিয়েছিল।

২০১৬ সালের মার্চ মাসের শেষ দিকে সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকা দক্ষিণের বারকোট গ্রামে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। এসময় ওই বাড়ির নারী ও শিশুকে মারধর করারও অভিযোগ ওঠে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ ওঠে। জমিসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে দু’পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এরপর রাতে এশার নামাজের পর স্থানীয় মসজিদে এক পক্ষ এ নিয়ে মিটিং করে এবং মিটিংয়ের পর মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে সংখ্যালঘু রিপন দেবের বাড়িতে হামলা চালায় তারা। তার ঘরে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর করা হয়। মসজিদের মাইকে হামলার ঘোষণা দেওয়ার পর রিপন দেব ভয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। হামলাকারীরা বাড়িতে ঢুকে তার স্ত্রী ও শিশু সন্তানকে মারধর করে।

এ বছর (২০১৬ সালের) মার্চ মাসের আরেকটি ঘটনা। সিলেট শহরের কাজলশাহ এলাকা থেকে অপহরণ হওয়া এক নারীকে উদ্ধার করতে গিয়ে হামলার শিকার হয় পুলিশ। পুলিশের হাত থেকে তাকে ছাড়িয়ে রাখতে  এলাকাবাসী মসজিদের মাইকে ‘ডাকাত আক্রমণ করেছে’ ঘোষণা দিয়ে পুলিশের উপর হামলা চালায়।

এ বছরেরই ফেব্রুয়ারি মাসে মেহেরপুর জেলায় বুড়িপোতা ইউনিয়নে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে ফজরের নামাজ শেষে বুড়িপোতা ইউনিয়নের গোভিপুর গ্রামের মসজিদে গ্রামবাসীকে ইউনিয়ন পরিষদের পাশে বাগু দেওয়ান পীরের আখড়া উচ্ছেদে অংশ নিতে বলা হয়। তারপর সকলে সমবেত হলে পুলিশের উপস্থিতিতে গ্রামের বাগু দেওয়ান পীরের আখড়া গুড়িয়ে দেয়া হয়। পীরের আখড়া উচ্ছেদে গ্রামবাসীদের কেউ অংশ না নিলে তাকে দেড় হাজার টাকা জরিমানা করা হবে এমন ঘোষণাও মসজিদের মাইকেও দেয়া হয়। এ সময় ১০ বিঘা জমিতে আবাদ করা আম, জাম, কাঁঠাল, পেপেসহ বিভিন্ন ধরণের গাছপালা কেটে ফেলা হয় ও পীরের বাড়িতে আগুন দেয়া হয়। এরপর হাজারেরও বেশি গ্রামবাসী একযোগে পীরের পাকা ‘ইবাদতখানা’ ও রান্নাঘর ভারি শাবল ও হাতুড়ি দিয়ে গুড়িয়ে দেয়। মসজিদের মাইকে আখড়া ভাঙার ফেলার আহবান শুনে মেহেরপুর থানা থেকে একদল পুলিশ বাগু পীরের বাড়িতে গিয়ে অবস্থান নেয়। কিন্তু গ্রামবাসীর লাঠি-সরকি ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা করলে পুলিশ পিছু হটে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় যে ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত পুলিশের উপস্থিতিতেই পীরের আখড়া উচ্ছেদ করে গ্রামবাসী। এ সময় ওই সড়ক দিয়ে সব ধরনের চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পীরের খাদেম আলম হোসেন অভিযোগ করেন পীরের আখড়ার জায়গা দখলে নিতেই পরিকল্পিতভাবে কিছু লোকের ইন্ধনে পরিকল্পিতভাবে গ্রামবাসী হামলা চালিয়েছে। এতে অন্তত কয়েক লাখ টাকা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতেই আরেকটি ঘটনা ঘটে। মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগরে এক স্কুলছাত্রীর শ্লীলতাহানির ঘটনায় ওই এলাকার চারটি গ্রামের মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা দিয়ে ছাত্রীদের স্কুলে যেতে নিষেধ করা হয়।

২০১৪ সালের আগস্টে লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার কেরোয়া ইউনিয়নের কেরোয়া গ্রামে  দিবাগত রাতে মসজিদের মাইকে ‘এলাকায় ডাকাত ঢুকেছে’ এমন মিথ্যে ঘোষণা দিয়ে প্রতিপক্ষের লোকজনের ওপর হামলা হয়। ইসলামিক রাজনৈতিক দল জামায়াত ইসলামের ছাত্র সংগঠন শিবির েএর স্থানীয় কর্মী আবদুল লতিফ তার লোকজন নিয়ে প্রতিপক্ষ নূর মোহাম্মদের ছেলে মো. হানিফ ওরফে মিন্টুর ওপর হামলা চালান।

কুমিল্লা জেলায় ২০১৪ সালের মার্চ মাসে মনোহরগঞ্জে পরকীয়া সংক্রান্ত ঘটনার জেরে দুই গ্রামের মসজিদের মাইকে পাল্টাপাল্টি ঘোষণা দিয়ে হামলা ও সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষ চলাকালে সন্ত্রাসীদের গুলিতে এক এসএসসি পরীক্ষার্থীসহ অন্তত ২০ জন গুলিবিদ্ধ ও শতাধিক আহত হয়।  এছাড়া হামলা চালিয়ে এক গ্রামের অর্ধশতাধিক বাড়িঘর ও দোকান ভাংচুর এবং কয়েকটি স্থানে আগুন দেওয়া হয়, লুটপাটের ঘটনাও ঘটে।

২০১৫ সালের জুলাই মাসে কুমিল্লা জেলার মুরাদনগরে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে ‘ডাকাত’ সাজিয়ে মুনির নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটে। প্রতারিত হয়ে বিদেশ থেকে ফিরে আসা যুবককে হত্যার এই ছবি মোবাইলে ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয় দালালচক্র। মসজিদের মাইকে ডাকাত ঘোষণাকারী মসজিদের ইমাম আবুল হাসানকে পুলিশ আটক করে। তদন্তে বেরিয়ে আসে যে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে স্থানীয় এক ট্রাভেল ব্যবসায়ীর মাধ্যমে দুই বছরের চুক্তিতে দুবাই গিয়েছিলো মুনির, কিন্তু প্রতারিত হয়ে কয়েক মাসের মাথায় দেশে ফেরত আসায় ট্রাভেল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলীর কাছে টাকা ফেরত চায় মুনির। টাকা না দিতেই ডাকাত সাজিয়ে হত্যা করা হয় তাকে।

মসজিদ থেকে শুক্রবার জুম্মার নামাজের আগে বাংলা ভাষায় দেওয়া খুতবায় জঙ্গিবাদী বক্তব্য প্রদানের অভিযোগ আছে এবং তা মাইকে সরাসরি প্রচার করা হয় , তাই জঙ্গিবাদ রোধে নতুন উদ্যোগ নিতে চাচ্ছে ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ (ইফাবা)। এজন্য শুক্রবার জুমার নামাজের আগে মুসল্লিদের উদ্দেশে দেওয়া খতিবের বয়ান বা খুতবা দেয়ার পদ্ধতি এবং খুতবার ভাষা কী হবে তার দিক নির্দেশনা দেবে ইফাবা।  বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ রোধে সরকারের দিক নির্দেশনার অংশ হিসেবেই শুক্রবারের জুম্মার নামাজের আগে আরবি ভাষায় খুতবা দেওয়ার শর্ত আরোপ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানে ইসলামের শুরুর সময় থেকে আরবিতেই খুতবা দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। কিন্তু এখন বাংলায় দেয়া হচ্ছে। সরকার চাচ্ছে জুম্মার নামাজের আগে খুতবা যেন আরবিতে দেয়া হয়, তবে সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে খুতবার আগে এর সারমর্ম বাংলায় বলতে পারেন। কেননা বাংলাদেশের মাতৃভাষা বাংলা। আরবি স্বল্পসংখ্যক লোক জানেন। খুতবায় সমকালীন সামাজিক সমস্যাবলী নিয়ে আলোচনা ও সমাধানের দিকনির্দেশনা থাকতে পারে। তবে রাজনৈতিক কোনও কিছু থাকতে পারবে না। আল্লাহর নামের ঘরে বসে এখন যে ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য মসজিদের মাইক থেকে শুক্রবার জুম্মার নামাজের আগে দেয়া হয় তাতে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন ইসলাম কি একটি ধর্ম নাকি আধিপত্যবাদী ধারণা। বাংলাদেশে ২টি বিভাগীয় সম্মেলনের মাধ্যমে খতিবদের কাছে এ ধরনের দিক নির্দেশনা সরকারের তরফ থেকে পৌঁছানো হয়েছে। আর বাকি ৫টি বিভাগীয় পর্যায়ে এবং জেলাপর্যায়ে ইমামদের কাছে এ নির্দেশনা দেওয়া হবে। ইসলামি ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ (ইফাবা) এর মহাপরিচালক বলেছেন যে খতিবরা তো মসজিদ নিয়ন্ত্রণ করেন। মুসল্লিদের প্রতি তাদের প্রভাব কাজ করে। সাধারণত বাংলাদেশের আলেমরা আরবিতেই খুতবা দিয়ে থাকেন। এটা তো নিয়মের কিছু নয়। নিয়ন্ত্রণেরও কিছু নয়। আহনাফ ও আহলে সুন্নাত মতাদর্শীরা তো আরবিতেই খুতবা দেন। এতে দ্বিমত করে সালাফি মতালম্বী ও এ দেশের জামায়াতে ইসলামী। জঙ্গিবাদে উতসাহিতকরণ রোধে নিসন্দেহে এটি একটি ভাল উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তবায়ন করা কঠিন। এ উদ্যোগের বিরোধিতা করছে উগ্রবাদীরা। ধর্মভিত্তিক দল হেফাজতে ইসলাম বলছে যে, খুতবা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হলে ফল ভাল হবে না। এটি জুমার খুতবার নিয়ম, পদ্ধতি, বিষয়, ধরন কোন আলেমের মনগড়া বিষয় নয়। এটি ১৪০০ বছর আগে মহান আল্লাহর প্রিয় রাসূল হজরত মুহাম্মদ সা:-এর নির্দেশিত মূলনীতির আলোকে প্রদান করা হয়।’  এ কারণে তারা মনে করে খুতবা নিয়ন্ত্রণ তাদের রাসূলের জীবনব্যবস্থাকে বিকৃত করার ষড়যন্ত্র। হেফাজতে ইসলাম নামের উগ্রবাদী দলটি  খুতবা নিয়ন্ত্রণ বিরোধিতায় আবার রাস্তায় সহিংসতা চালাতে নামতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসা ভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম সবচে বড় ইসলামিক সংহিস দল হিসেবে গত কয়েক বছরে নিজেদেরকে রাজপথে আবির্ভূত করেছে। এরা বিভিন্ন ইসলামিক ইস্যুতে সরকারকে চাপের মধ্যে রাখছে এবং দাবী আদায়ে সহিংসতার পথ বেছে নিয়েছে।

২০০৯ সালে সৌদি সরকার উচ্চ স্বরে মসজিদের মাইকে আযান দেয়ায় অনেক মসজিদের মাইক খুলে নিয়ে গিয়েছিল ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে লোক এসে। সৌদি সরকারী প্রেস এজেন্সি (SPA) জানিয়েছে য়েসব মসজিদ আজানের সময় প্রয়োজনের তুলনায় মাইকে উচ্চ শব্দ করবে ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে তাদের লাউড স্পিকার খুলে নেয়া হবে। বাংলাদেশে আচার-আচরণে সৌদি আরবকে অনুসরণ করার চেষ্টা করে, কেননা তারা মনে করে যেহেতু এখানে ইসলাম নাজিল হয়েছিল সেজন্য এটি আল্লাহর দেশ। অথচ বাংলাদেশে মসজিদের মাইকে নিয়ে প্রায়শ নষ্ট খেলা চলছে, জনগণকে খুনের নেশায় উন্মক্ত করা হচ্ছে। এ নষ্ট খেলা বন্ধ হোক, মসজিদের মাইক ব্যবহারে সরকার নীতিমালা প্রণয়ন করুক, অপব্যবহার হলে আইনের আওতায় এনে ব্যবহারকারীকে শাস্তি দিক। যদি এখনই পদক্ষেপ না নেয়া হয় তাহলে আগামীতে মসজিদের মাইক নিয়ে ২০১৩ সালের থেকেও বড় ধরনের সংকটে পড়বে বাংলাদেশ।

 

Supporting link—

1)      http://www.arabnews.com/saudi-arabia/news/757636

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s