ধর্ম ইতিহাসের আঁস্তাকুড়, মানুষের ধর্ম মানবতা

ছোটবেলা থেকেই পরিবার থেকে ধর্ম বিষয়ক শিক্ষা পেয়ে আসছি। যেন ধর্ম এমন একটি বিষয় যা অবশ্যই পালনীয়, কোন কিছুর বিনিময়ে ধর্ম ত্যাগ করা যাবে না, অর্থাৎ ধর্ম মানতে মানুষ বাধ্য। শিক্ষা পেয়েছি স্বর্গ নরক বিষয়ে, মৃত্যুর পরেও আরো আরেকটি জগত আছে সেখানে স্বর্গ নরক প্রাপ্তি নির্ভর করে বর্তমান পৃথিবীতে বেঁচে থাকা মানুষের ভাল-মন্দ কর্মের উপরে। স্কুলের সহপাঠিরা প্রায়ই আমার সঙ্গে মিশতে চাইতো না, খেলা করতে চাইতো না। প্রায়ই দিনই সহপাঠিরা আমাকে মালাউন বলেছে, তখন মালাউন শব্দের অর্থ আমি বুঝতাম না। হিন্দুদের তুচ্ছ/গালি অর্থে মালাউন বলে সম্বোধন করা হয়। এই মালাউন শব্দটা শুনতে শুনতে আমি বড় হয়েছি। আমি মালাউন, আমি হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহন করেছি তাই আমার সহপাঠিরা আমার সঙ্গে খেলতো চাইতো না। তখন আমার মনে হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খেতো, আমি তো দেখতে আমার বন্ধুদের মতই, মানুষের মতই। মালাউন কি তবে মানুষের মতই আলাদা কোন জাত? যদি তাই হয় তবে আমি মানুষের সাথে একই স্কুলে পড়ছি কেন? আমি মালাউন শব্দের অর্থ ভেতরে ভেতরে খুঁজতে থাকি, উত্তর মেলাতে পারি না। এমনই এক বৈষম্যের মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠতে থাকি। যখন স্কুল থেকে বাড়ী ফিরে আসি তখন পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা আমাকে বুঝায় আমি হিন্দু, মুসলমানদের থেকে যেন দূরত্ব রেখে চলি, কেননা মুসলমানেরা নাকি ভয়ংকর, ওরা যা খুশী করতে পারে। ওদের সাথে যেন ঝগড়া না করি। এক রকম কোনঠাসা একটা অবস্থার মধ্যে বেড়ে উঠতে থাকি, ভাবি আমরা সকলেই তো দেখতে একই রকম তাহলে আমাদের পরিচয় শুধুমাত্র মানুষ নয় কেন? কেন আমরা কেউ হিন্দু, কেউ মুসলমান, কেউ বৌদ্ধ, কেউ খ্রিস্টান? উত্তর মেলানো সে ছোট বয়সে এত সহজ ছিল না। স্কুলজীবন শেষ করে কলেজে পা রাখি, তখন হঠাত মনে হলো আমি তো ধর্মের বইগুলো পড়ে দেখতে পারি এবং পড়ে জানতে পারি সবাই কেন তার নিজের ধর্ম গ্রন্থগুলোকে শ্রেষ্ঠ বলে! শুরুও করলাম পড়তে রামায়ন, গীতা, মহাভারত, বেদ, বাইবেল, কোরান, ত্রিপিটক। যখন দেখলাম সমাজে প্রচলিত তথাকথিত ধর্মের নামে মানুষ জীবনও দিতে প্রস্তুত একটি প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক করছে, স্রষ্টা কি চান যে মানুষ আত্নঘাতী হউক, যারা ধর্মে বিশ্বাস করে? মনযোগ আকর্ষণ করেছে নাস্তিকতা বিষয়ক বইগুলো। আস্তিকেরা প্রমাণ করতে পারেননি ঈশ্বর আছে, নাস্তিকেরা প্রমাণ করতে পারেনি ঈশ্বর নেই। আমি অনেক ভেবেছি, আমার এই ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক দিয়ে প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে ঈশ্বর আছে কি নেই! আমি ঈশ্বর বিষয়ক ভাবনা থেকে নিজেকে মুক্ত করলাম। ঈশ্বর থাকলে আছে, না থাকলে নেই তাতে আমার কি এসে যায়! আমি এই পৃথিবীটাকে দেখতে পাই, মানুষ দেখতে পাই, পৃথিবীতে যা কিছু আছে, দেখতে পাই, জানতে পারি, ভাল-মন্দ অনুভব ও উপলব্ধি করে করতে পারি। মানুষের জন্য একটি সভ্য সমাজ বিনির্মাণে আমি একজন যোদ্ধা মাত্র। ”মানুষকে ভালোবাস” প্রতিটি ধর্মই এই বাক্যটি বলে থাকে। এই ধর্মগুলো যদি একে অপরের প্রতি ভালোবাসার বিষয়ে শিক্ষা দিতে সফল হতো, তা হলে মানুষ একে অপরের নিকটবর্তী আরও একতাবদ্ধ হতো। আসলে একতার ক্ষেত্রে তথাকথিত ধর্ম কি জোরালো প্রভাব রাখতে পেরেছে? সম্প্রতি জার্মানীতে এক সমীক্ষায় এই প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, ”ধর্ম কি লোকেদের এক করে নাকি তাদের পৃথক করে বলে মনে করেন?” উত্তরদাতাদের মধ্যে ২২% ব্যক্তি মনে করে যে ধর্ম এক করে আর অন্যদিকে ৫২% ব্যক্তি মনে করেন যে তা বিভক্ত বা পৃথক করে।  বিগত ১০০ বছরের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাব ধর্ম লোকেদের একে অপরের নিকটবর্তী করার পরিবর্তে বরং তাদেরকে পৃথক করেছে। মানুষ মানুষের কাছ থেকে বিছিন্ন হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে  কোনো কোনো ঘটনায়, ধর্ম এমন এক আবরণ হয়ে এসেছে, যার আড়ালে সব চেয়ে মারাত্মক নৃশংসতা সম্পাদিত হয়েছে এবং বর্তমানেও হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে বলকান অঞ্চলের রোমান ক্যাথলিক, ক্রোয়েশীয় এবং অর্থোডক্স সার্বীয়রা একে অপরের বিরুদ্ধে হিংস্র লড়াইয়ে মেতে উঠেছিল। উভয় দলই যীশুখ্রীষ্টকে অনুসরণ করতো বলে দাবী করেছে। যিনি তার অনুসারীদের প্রতিবেশীদেরকে ভালোবাসার শিক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের লড়াই এমন দিকে পরিচালিত করেছিল, যা ইতিহাসের সবচেয়ে আতঙ্কিত এক বেসামরিক বেপরোয়া হত্যাকান্ড হিসেবে পরিচিত। পাঁচ লক্ষেরও বেশী নারী-পুরুষ এবং শিশুর মৃত্যুতে বিশ্ববাসী ভীতবিহ্বল হয়ে পড়েছিলো।  ১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৪০কোটি। যা ছিল ততকালীন পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ২০ভাগ। এ ৪০ কোটি জনসংখ্যা ছিল মূলত হিন্দু, মুসলমান এবং শিখ। ভারত যখন ভাগ হয়ে যায় তখন ইসলামি রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্ম হয়। সেই সময় ধর্মের কারণে পর পর কয়েকটা বেপরোয়া হত্যাকাণ্ডে উভয় দেশের লক্ষ লক্ষ শরণার্থীকে পুড়িয়ে মারা হয়, মারধর করা হয়, অত্যাচার করা হয় এবং গুলি করে মারা হয়।

পিছিয়ে নেই হিন্দুধর্মের হিন্দুরাও। ভারতে বেশ কিছু হিন্দু ধর্মীয় মৌলবাদী সংগঠন আছে। যেমন–ইসকন, আনন্দমার্গ, শিবসেনা ইত্যাদি। এরা ধর্মের নামে মানুষকে বাধ্য করে নিরামিষ খেতে, দেবদেবীর উদ্দেশ্যে শিশু বলি দেয়, মসজিদ দখল করে মন্দির বানায় (ভারতের বাবরী মসজিদ ভেঙে ফেলে সে জায়গা দখল করে হিন্দুদের ধর্মের দেবতা রামকে নিয়ে মন্দির তৈরির করার চেষ্টা হলে তা নিয়ে দাঙ্গা বিশ্ববাসীর দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এমন অনেক ঘটনা প্রতিদিন ঘটে চলেছে যা আমরা সংবাদপত্রের মাধ্যে জানতে পারি। উপরের চাঞ্চল্যকর উদাহরণ ছাড়াও নতুন শতাব্দীর সূচনায় ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের আতঙ্ককে সারা বিশ্বে আলোচনার শীর্ষে নিয়ে আসে। আজকে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদ সারা বিশ্বকে সতর্ক ও সন্ত্রস্ত করেছে এবং অনেক সন্ত্রাসীদল দাবী করে যে তারা ধর্মের সাথে যুক্ত, তারা তাদের স্বধর্ম সারাবিশ্বে কায়েম করার জন্য কাজ করছে। এভাবে ধর্ম হয়ে উঠেছে ক্রমে আধিপত্যবাদের হাতিয়ার। এখন আর ধর্মকে একতার প্রবর্তক হিসেবে দেখা হয় না, এর পরিবর্তে এটা প্রায় দৌরাত্ম ও অনৈক্যের সাথে সংযুক্ত। জার্মান সংবাদপত্রিকা ‘ফোকুস’ ইসলাম, খ্রীষ্টান, কনফুসিয়াস, বৌদ্ধ, ইহুদী ও হিন্দু ধর্মকে বারুদের সাথে তুলনা করেছে।  যদিও কিছু ধর্ম একে অপরের সাথে যুদ্ধ করে কিন্তু অন্যরা নিজেদের মধ্যে কলহে জর্জরিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তথাকথিত ধর্মীয় মতবাদ সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে তর্কবিতর্ক বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষ বিভক্ত পড়েছে। জন্মনিয়ন্ত্রণ কি অনুমোদনযোগ্য? গর্ভপাত সমন্ধে কি বলা যায়? সমকামীতার প্রতি কেমন দৃষ্টিভঙ্গি থাকা উচিত? একজন মহিলার কি শাসক নিযুক্ত হওয়া উচিত? নারী স্বাধীন নাকি পুরুষের অধীন? নারীর পোশাক, আচরণ ও চলাফেরা কেমন হওয়া উচিত? কারা ক্ষমতাবান ও পৃথিবী শাসন করবে? যুদ্ধের প্রতি কি ধর্মের অনুমোদন থাকা উচিত?এই ধরনের নানা মতনৈক্য দেখে অনেকের মনে একটি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে– ”যে ধর্ম কিনা এমনকি নিজ সদস্যদের এক করতে পারে না, সেটা কিভাবে মানবজাতিকে এক করবে?”  স্পষ্ট্তই অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধর্ম একতার এক জোরালো প্রভাব হতে ব্যর্থ হয়েছে। এমন কোনো ধর্ম কি আছে যা ভিন্ন, যা মানব জাতিকে এক করতে পারে? এক পতাকার তলে নিয়ে আসতে পারে? আমি শুধু বুঝি, আগুনের ধর্ম জ্বলা আর মানুষের ধর্ম মানবতা।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s