বরিশালে গোড়াচাঁদ দাসের বাড়ির নাম কেন কবি সুফিয়া কামাল ছাত্রীনিবাস রাখা হল ?

বরিশালে গোড়াচাঁদ দাসের বাড়ির নাম কেন কবি সুফিয়া কামাল ছাত্রীনিবাস রাখা হয়েছে,কেন গোড়াচাঁদ দাস ছাত্রীনিবাস রাখা হল না?

বরিশালে চল্লিশের দশকে গোড়াচাঁদ দাস আইনপেশায় বেশ সুনাম করেছিলেন। সে সময়ের হিসেবে বহু টাকা খরচ করে শহরের প্রাণকেন্দ্রে অট্টালিকা তৈরি করেছিলেন। তার নামে রাস্তার নাম হয়, আজ সকলে সে রাস্তাকে গোড়াচাঁদ দাস রোড বলে চেনে। ১৯৪৭ এর ভারত ভাগের পর ১৯৫০ এর ভয়ঙ্কর দাঙ্গার সময়ে বরিশালে কয়েক হাজার হিন্দু নিহত হলে গোড়াচাঁদ বাবুও দেশ ছেড়ে পরে কলকাতায় পাড়ি জমান।
পরে তার বাড়িটি পরিত্যিক্ত সম্পত্তি হিসেবে নানা সময়ে বিভিন্ন সরকারী অফিসের কোয়ার্টার হিসেবে হাত বদল হয়েছে। পুরনো অংশটির সঙ্গে বর্ধিত অংশ জোড়া দিয়ে বর্তমানে এ বাড়িটি বরিশাল সরকারী মহিলা কলেজের ছাত্রীনিবাস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে! নাম রাখা হয়েছে– কবি সুফিয়া কামাল ছাত্রীনিবাস। আমার প্রশ্ন হল গোড়াচাঁদ দাসের বাড়ির নাম কেন সুফিয়া কামালের নামে হবে? সুফিয়া কামাল কবি হওয়ায় ও তার জন্ম বরিশালে হওয়ায় বরিশালের কোন সুধীজন বা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিরা এ নিয়ে কখনও সরব হননি।
যে মানুষটি রক্ত জল করে বাড়িটি তৈরি করেছিলেন ব্যয় করেছিলেন তার সমুদয় সব উপার্জন তার নামে কেন রাখা হল না বরিশাল সরকারী মহিলা কলেজের ছাত্রীনিবাসের নাম? এভাবে করেই তো বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের অবদান ইতিহাসের অতলে চাপা দেয়া হয়েছে, সেখানে যেমন ব্যক্তিও জড়িত, তেমনি সবসময়ই রাষ্ট্রীয় ও সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ছিল বা আছে। বরিশালের জনমানুষের কাছে দাবী যেন এ ছাত্রীনিবাসের নাম বদলে গোড়াচাঁদ দাস ছাত্রীনিবাস রাখার দাবীতে কথা বলেন, অস্বীকৃতি বা এড়িয়ে যাবার ছলে যেন চতুর ইতিহাস বিকৃতির নিরব সাক্ষী আমরা না হই।

কে  শোনে এ কথা ! গোঁড়াচাঁদ দাস হলেও ওনার বাড়ী গোঁড়াচান শীলের বাড়ী নামেই পরিচিত ছিল এলাকায়। গোঁড়াচাদ দাসের তো ওই একটি বাড়িই নয়। এই এলাকার একটা বিশাল অংশ জুড়েই ছিল বাড়ী। ওনার বাড়ীর সংলগ্ন ব্রাউনকম্পাউন্ড মসজিদের পেছনে জর্জের বাড়ী বলে পরিচিত বাড়ীটি গোঁড়া চাঁদ দাসের মেয়ের জামাইকে দিয়েছিলেন, তার বিপরীতে হাকিম মাস্টারের বাড়ীটি তারই ছিল এবং তার সহকারী জুনিয়র উকিল ও মোক্তাররা থাকতেন, রাস্তার এপাশে খালের পাড়ের যে বাড়ীগুলি ছিল সেটা গোঁড়াচাদের কাছারী ঘর বলেই শুনে এসেছি ছোটবেলা থেকে। এসবই আজ ইতিহাস। সরকার মূল বাড়ীটি একোয়ার করে নিয়ে বানিয়েছিল ম্যজিস্ট্রেট কোয়ার্টার, গণিমিয়া নামে একজন ম্যজিস্ট্রে্ট ছিলেন ৬০ এর দশকে, এর পরে সরকারি মহিলা কলেজের প্রভাষক কোয়ার্টার আর এখন মহিলা কলেজ ছাত্রী নিবাস। আর বাকী অংশের খালী জায়গা বা বাড়ী ব্যক্তি মালিকানায় চলে গেছে। কেন এবং কিভাবে ওনার মালিক হলেন, এটাও একটা প্রশ্ন! গোঁড়াচাঁদ দাসের বাড়ীর পুকুরের পিছনের বাড়ী অর্থাৎ সার্বেক প্রেসিডেন্ট রহমান বিশ্বাসের বাড়ীর বিপরীতে দিকে দিয়ে যে গলিটা গেছে যার নাম শ্যামবাবু লেন, লাল রঙের বাড়ীটা আজো দাঁড়িয়ে আছে, নেই তার কোন পরিবার বা কোন নিকট আত্নীয়। তার বিপরীতে যে রাস্তা শশী মিষ্টির দোকানের পাশ দিয়ে চলে গেছে তার নাম দ্বীনবন্ধু সেন রোড, বাড়ীটা হলুদ রঙের ছিল, এ দেশ ছেড়ে চলে গেছেন অনেকে। এদের নামে রাস্তার নামকরনের ফলে আজো মানুষ জানতে পারছে তাঁদের কথা, হয়তো নাম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে হারিয়ে যাবে তাদের নাম কালের গর্ভে, লেখা হবে নতুন ইতিহাস। জমির দখলকারী নতুন মালিকের ইতিহাস। বরিশালের প্রগতিশীল সুশীল, সুধীজন বা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিরা এদের বাড়ী সংরক্ষণ করার যথেষ্ট প্রয়োজনবোধ করেনি।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s