মোল্লা, তলোয়ার, শিরোচ্ছেদ, সংখ্যালঘু নারী ধর্ষণ–এসব শব্দ থাকার পরও কেন মোল্লাহাটের ঘটনাকে আমরা সংখ্যালঘু নির্যাতন বলবো না?

somoy-sidd-dorson-m20160521144736
সাং-শোলাবাড়িয়া গ্রাম, মোল্লাহাট, বাগেরহাট। যেন এক মধ্যযুগীয় জনপদ। যেখানে সোবাহান মোল্লা নামের এক নরপশু সংখ্যালঘু এক নারীকে দিনের পর দিন ধর্ষণ করার পর পুনরায় ধর্ষণ করতে গেলে ঐ নারীর স্বামী বাঁধা দিলে তার ঘাড়ে তলোয়ার দিয়ে কোপ দেয়, স্বামীকে বাঁচাতে গেলে কোপ গিয়ে পড়ে সংখ্যালঘুর নারীর পায়ে, পা  বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাকে হাসপাতালে নিতে বাঁধা দিয়ে বর্বর সোবাহান মোল্লা হাতুড়ে ডাক্তার দিয়ে পা জোড়া দেয়। পায়ের পঁচন ধরলে ব্যথায় চিৎকার করে সংখ্যালঘু নারী। তারপর পড়শিরা এগিয়ে আসে। এ হল ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ। ঘটনাটি শুনতে মধ্যযুগের হলেও এটি বাংলাদেশের কোন মধ্যযুগের ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ নয়। এ ঘটনা ঘটেছে এই ২০১৬ সালে উল্লেখ্য স্থানে।
জায়গার নাম মোল্লাহাট। অপরাধীর নামের পদবী ’মোল্লা।’ মোল্লা বলতে আমরা মুসলমান ধর্মপরায়ণ ব্যক্তিকে বুঝে থাকি। ‘বঙ্গীয় শব্দকোষে মোল্লা শব্দের অর্থ করা হয়েছে মুসলমান পুরোহিত। বস্তুত এভাবে মসজিদে নামাজ পরিচালনার কারণেও অনেকে মোল্লা উপাধি পেয়েছিল এবং তারপর থেকেই মোল্লা পদবীর ব্যবহার শুরু হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, মোল্লা হচ্ছে তুর্কি ও আরবি ভাষার মোল্লা থেকে আগত একটি শব্দ যার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে পরিপূর্ণ জ্ঞান বিশিষ্ট মহাপন্ডিত ব্যক্তি। অন্য অর্থে মুসলিম পন্ডিত বা ব্যবস্থাপক বা অধ্যাপক হলেন মোল্লা। পরবর্তীকালে মসজিদে নামাজ পরিচালনাকারী মাত্রই মোল্লা নামে অভিহিত হতে থাকে। এখান থেকেই সাধারণত বংশ পদবী হিসেবে তা ব্যবস্থার হওয়া শুরু হয়।’
আমরা এবার ১৪ অক্টোবর দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত খবর ও  ঘটনাক্রমের দিকে তাকাই, শোলাবাড়িয়া গ্রামের মৃত মোহাম্মাদ মোল্লার ছেলে এলাকার মূর্তিমান আতঙ্ক দস্যু চরিত্রের সোবাহান মোল্লা বেশ কিছুদিন ধরে প্রতিবেশী সংখ্যালঘু এক পরিবারের সকলকে হত্যার হুমকি দিয়ে ওই পরিবারের বত্রিশ বছর বয়স্ক গৃহবধূকে দিনের পর দিন ধর্ষণ করে। লোকলজ্জা ও জীবনের ভয়ে উক্ত ঘটনা গোপন রেখে সোবাহানকে মোল্লাকে কৌশলে নিবারণের চেষ্টা করে উক্ত সংখ্যালঘু গৃহবধু। একপর্যায়ে গত ২৯ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে সোবাহান মোল্লা ওই বাড়িতে গিয়ে গৃহবধুকে তলোয়ার দেখিয়ে ঘরের দরজা খুলতে বলে। নতুবা সকলকে পুড়িয়ে মারার হুমকি দেয়। তখন বাধ্য হয়ে গৃহবধূ ঘরের দরজা খুলে দেয়। বেপরোয়া সোবাহান গৃহবধুকে ধর্ষণ আবারও করতে চায়। তখন তার স্বামী বাধা দিলে তাৎক্ষণিক তলোয়ার দিয়ে গৃহকর্তাকে ধাওয়া করে শিরোচ্ছেদের উদ্দেশ্যে কোপ দেয়। এ সময় স্বামীকে রক্ষা করতে গেলে তলোয়ারের কোপে ধর্ষিতা গৃহবধুর ডান পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পৈশাচিক এ ঘটনার পরও ঘটনাটি চাপা দেওয়ার জন্য গৃহবধুকে হাসপাতালে নিতে বাধা দেয় এবং অস্ত্রের মুখে হুমকি দিয়ে ওই পরিবারকে গৃহবন্দী করে রাখে। পরে এক হাতুড়ে চিকিৎসককে ডেকে বাড়ীতে এনে সেলাই এবং ব্যান্ডেজ দিয়ে পা আটকে দেয়। কিন্তু ওই গৃহবধুর অবস্থা ক্রমশ: অবনতি হতে থাকে। এরপর গত বুধবার উক্ত গৃহবধূর যন্ত্রণাকাতর চিৎকার শুনে সাহসী প্রতিবেশি মনির মুন্সিসহ কয়েক ব্যক্তি ওই বাড়ীতে গিয়ে বিষয়টি জানতে পেরে তাকে তাৎক্ষণিক উদ্ধার করে মোল্লাহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়। ওই সময় জরুরী বিভাগের দায়িত্বরত চিকিৎসক ব্যান্ডেজ খুলে দেখেন পায়ে পঁচন ধরেছে।
এ হল তথাকথিত বাংলাদেশের গ্রামে সংখ্যালঘু নিরযাতনের একটি সাম্প্রতিকতম চিত্র–ঘৃণ্য উদাহরণ। যেখানে মানুষকে আর মানুষ বলে গণ্য করা হয় না। মানুষকে গণ্য করা হয় সংখ্যালঘু হিসেবে। নারী হয়ে যায় সংখ্যালঘু নারী। যাকে বারবার ধর্ষণ করা জনৈক মোল্লার অবশ্য কর্তব্য হয়ে ওঠে। আইএস সিরিয়ায় সংখ্যালঘু ইয়াজেদি নারী ধর্ষণের সময়ে ভুক্তভোগীদের ব্যাখ্যা হিসেবে বলে এর মাধ্যমে তারা যেমন যৌন চাহিদা মেটাতে পারবে, তেমনি তারা আরও স্রষ্টার নৈকট্য লাভ করবে। সংখ্যালঘু নারী হয়ে যায় গণিমতের মাল। তাকে বারবার তার স্বামী, পরিবার-পরিজনের সামনে ধর্ষণ করা যায়। তাতে কোন দোষ নেই। এরকম ঘটনা এ বছর জানুয়ারিতে হবিগঞ্জের বানিয়াচং  উপজেলায়ও দেখেছি, সেখানে এক সংখ্যালঘু গৃহবধূ ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় তাকে স্বামী ও নিজ সন্তানের সামনে ধর্ষণ করা হয়। মোল্লাহাটের ঘটনায় দিনের পর দিন ধর্ষণ করে ক্ষ্যান্ত দেয়নি ধর্ষক, কেননা সংখ্যালঘু নারী দুর্বল–তাকে যখন তখন ধর্ষণ করা যায়, তলোয়ার নিয়ে তার বাড়ি গিয়ে ভয় দেখানো যায়, দরজা না খুললে বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়ার ভয় দেখান যায়, তাতে কিছু যায় আসে না। সে সংখ্যালঘু পরিবারের অবস্থা হয় তখন গর্তে আটকে পড়া ইঁদুরের মতো, যেন ধোঁয়া দিলেই সে বেরিয়ে আসবে।বাংলাদেশের গ্রামে সংখ্যালঘু নারীর এমন ফাঁদ পাতা আছে অহরহ। যদি কেউ প্রতিবাদ করে তাহলে তার কপালে জুটবে শিরোচ্ছেদের উদ্দেশ্যে তলোয়ারের কোপ। বাধা দিতে গিয়ে সংখ্যালঘুর নারী পা বিচ্ছিন্ন হবে, তার চিকিৎসাও জুটবে না। নিজের পঁচে যাওয়া পায়ের গন্ধে ব্যথায় কাতরাবে সে। তখন হয়তো কেউ করুণা করে, সাহস করে এগিয়ে আসবে হয়তো কোনমতে তার প্রাণটা বাঁচবে।
সমগ্র বাংলাদেশের গ্রামে সংখ্যালঘু নারীদের পরিস্থিতি এমনই উদ্বেগজনক। এক মাস আগের ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ হল যখন সে নারী বারবার ধর্ষিত হল, তাদের পুরো পরিবার গ্রামের সমাজের কাছে মানসম্মানহীন হল, সে নারী পা হারাল স্বামীর শিরোচ্ছেদ ঠেকাতে গিয়ে।
শব্দগুলো দেখুন, মোহাম্মাদ মোল্লার ছেলে। মোহাম্মদ হল মুসলমানদের নবীর নাম। তার ছেলে সোবাহান মোল্লা। যার হাতে তলোয়ার, সে সংখ্যালঘু গৃহবধূকে আবার ধর্ষণ করতে না পেরে চেয়েছিল তার স্বামীর শিরোচ্ছেদ করতে।
দেখুন শব্দগুলো–
– মোল্লাহাট
– মোহাম্মদ মোল্লা
– সোবাহান মোল্লা
– তলোয়ার
– শিরোচ্ছেদ
– সংখ্যালঘু নারী ধর্ষণ
এরপরও কেন একে সংখ্যালঘু নির্যাতন বলবো না?
Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s