বাক-স্বাধীনতার ওপরে তিনটি রাষ্ট্রীয় আক্রমণ: নতুন এনজিও আইন, বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ ও প্রকাশক শামসুজ্জোহা মানিকের বিচার শুরু

‘বৈদেশিক অনুদান রেগুলেশন ২০১৬’ এর কালো ধারা….

আমরা গত কয়েক বছর ধরে শুনে আসছি বাংলাদেশে কর্মরত এনজিওদের কাজ করার ও বাক স্বাধীনতা রোধে নতুন আইন আসবে, অবশেষে সে আইন পাশ হয়েছে সংসদে অক্টোবর মাসে, নাম রাখা হয়েছে ‘বৈদেশিক অনুদান রেগুলেশন ২০১৬’। এ আইন পাশের কারণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে গত কয়েক বছরে বর্তমান সরকারকে ঢালাও সমালোচনা করে এসেছে বিভিন্ন এনজিও ও বেসরকারি সাহায্য সংস্থাগুলো। কোন কোন এনজিও বাংলাদেশে ইতোমধ্যে যথেষ্ট সম্পদ গড়ে তুলতে পেরেছে ও তাদের সেবা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে পেরেছে, তাদের যথেষ্ট ভিত তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে তাদের অর্থের যোগান যেহেতু আসে বিদেশ থেকে সেহেতু তাদের পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গেও ভাল একটি যোগাযোগ আছে, যার মাধ্যমে তারা দেশের বিভিন্ন ইস্যুতে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে সরকারকে নানা সময়ে রাজনৈতিক বিষয়ে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করে থাকে। যেমন গত বছর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টান্যাশনাল বাংলাদেশ’ এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান জাতীয় সংসদের কার্যক্রমের সমালোচনা করে সেটিকে ‘পুতুল নাচের নাট্যশালা’ বলেছিলেন, তখন ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক নেতারা বেশ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন তাদের বক্তব্যে। ধারণা করা হয় সে বক্তব্যটির কারণে গত ৫ অক্টোবর সংসদে পাশ করা এনজিও বিষয়ক নতুন এ আইনে একটি ধারা সংযোজন করা হয়, যেখানে বলা হয়েছে–‘‘কোন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা যদি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবমাননা করে কোন মন্তব্য করে তাহলে তার রেজিস্ট্রেশন বাতিল করা হবে।’’ এর পরিপ্রেক্ষিতে অনেক এনজিও উদ্বেগ জানিয়েছে,তারা বলেছে মূলত তাদের কাজ করার ক্ষমতাকে সীমিত করা হচ্ছে এর মাধ্যমে। ইতোমধ্যে মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনার পথ বন্ধ করার জন্য এ আইন করা হয়েছে। এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টান্যাশনাল বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ আইন ও সালিশ কেন্দ্রসহ ১৮টি স্বেচ্ছাসেবী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নেতারা আইনটিকে বাক-স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার খর্বের শামিল দাবি করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে– (১) চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তাদান করা হইল। (২) রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের, এবং (খ) সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা নিশ্চয়তা দান করা হইল। বাংলাদেশে শুধু এ সরকারের আমলে কেন কখনো মানবাধিকার পরিস্থিতি সন্তোষজনক ছিল না। আর বাংলাদেশ মানবাধিকার সংস্থাগুলো বেশিরভাগ এনজিও হিসেবে কাজ করে, আপাতদৃষ্টিতে দেশের বারে ও দেশের মাঝে চাপ প্রয়োগকারী সোসাটি হিসেবে সরকারকে বেশ চাপের মুখে রেখেছে। বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট আনের এ কালো ধারাটি এসব মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কণ্ঠরোধ করার জন্য অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন বন্ধের নির্দেশ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের…

অন্যদিকে মল্ট বেভারেজ ’অস্কার’ এর সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রিকেটার সাব্বির রহমানের চুক্তি বাতিল করার নির্দেশ দিয়েছে ক্রিকেটার সাব্বির রহমানের ও সব টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপনটির প্রচার বন্ধ করারও নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিসিবি। অস্কারের ওই বিজ্ঞাপনে কি আছে? বিজ্ঞাপনটি এ রকম– টিভি-পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে সাব্বিরকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, এমন সময় এক নারী পুলিশ অফিসারকে (নায়লা নাঈম) দায়িত্ব দেয়া হয় তাকে খুঁজে বের করার। পুলিশ অফিসার নায়লা নাঈম সাব্বিরের বাড়িতেই তাকে খুঁজে পান। বিসিবির মতে– ‘‘বিজ্ঞাপনটি অমার্জিত ও কুরুচিপূর্ণ। এখানে কিছু ‘আপত্তিকর’ দৃশ্য রয়েছে, যা বাংলাদেশের সংস্কৃতির সাথে মানানসই নয়। আর যেহেতু সাব্বির রহমান যেহেতু বিসিবির চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটার, তাই এখানে বিসিবির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে।’’ ধারণা করা হচ্ছে, ‘বিতর্কিত’ মডেল নায়লা নাঈমের সঙ্গে বিজ্ঞাপন করায় কারো কারো সমালোচনার প্রেক্ষিতে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিসিবি। ওই বেভারেজ কোম্পানির চিফ অপারেটিং অফিসার আনিসুর রহমান বলেন, “আমরা সব নিয়ম মেনেই সাব্বিরকে বিজ্ঞাপনের জন্য মনোনয়ন করেছিলাম। তাকে বিজ্ঞাপনের স্ক্রিপ্ট, বিপরীতে কে থাকছে সব জানিয়েছিলাম। তখন সাব্বির বিসিবির অনুমতি নিয়েই সবকিছু করতে রাজি হন। কিন্তু এতোদিন চলার পর হঠাৎ করেই এটা বন্ধ করতে আমাদের একটি ই-মেইল দেয় বিসিবি, আমরা সাব্বিরের ম্যাচ শেষ হওয়া পর্যন্ত সময় চেয়েছিলাম, কিন্তু বিসিবি বলেছে এখনই বন্ধ করে দিতে। আমরা সেটা বন্ধ করে দিয়েছি।” উল্লেখ্য যে কদিন আগে নায়লা নাঈম অভিনীত ব্রেস্ট ক্যান্সার রোধে সচেতনতা বিষয়ক একটি বিজ্ঞাপন চিত্র টেলিভিশনে প্রদর্শিত হয়, যেখানে দেখা যায় নায়লা নাঈম পোশাক খোলা অঙ্গভঙ্গি করছেন। এ বিজ্ঞাপন চিত্র নিয়ে পক্ষে ও বিপক্ষে নানা মতামত শুরু হয় সোশাল মিডিয়ায়। স্তন ক্যান্সার বিষয়ক অন্য একটি বিজ্ঞাপনে বিতর্কিত নায়িকা ও পর্ণ মডেল সানি লিওন অভিনয় করেন।

 

প্রকাশক শামসুজ্জোহা মানিকের বিরুদ্ধে চার্জশিট, শুরু হচ্ছে বিচার…

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার মতো লেখা আছে অভিযোগে অমর একুশে বইমেলা চলাকালে গত ১৫ ফেব্রুয়ারী রাতে ব-দ্বীপ প্রকাশন-এর স্টল থেকে ‘ইসলাম বিতর্ক’ নামের বইটির সব কপি জব্দ করে পুলিশ৷ আটক করে বই-এর লেখক ও ব-দ্বীপ প্রকাশন-এর মালিক শামসুজ্জোহা মানিক, ছাপাখানা শব্দকলি প্রিন্টার্সের মালিক তসলিম উদ্দিন কাজল ও ব-দ্বীপ প্রকাশন-এর বিপণন শাখার প্রধান শামসুল আলমকে৷ তাদের বিরুদ্ধে তখন তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭(২) ধারায় মামলা করা হয়৷ ওই সময় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার মতো লেখা আছে কি না তা অনুসন্ধানে ব-দ্বীপ প্রকাশন-এর আরো পাঁচটি বইয়ের সব কপি জব্দ করা হয়৷ সেগুলো হলো: ’আর্যজন ও সিন্ধু সভ্যতা’, ’জিহাদ: জবরদস্তিমূলক ধর্মান্তরকরণ’, ’সাম্রাজ্যবাদ ও দাসত্বের উত্তরাধিকার’, ’ইসলামের ভূমিকা ও সমাজ উন্নয়নের সমস্যা’, ’ইসলামে নারীর অবস্থা এবং নারী ও ধর্ম’৷ অন্যরা জামিন পেলেও প্রকাশক ও লেখক নুরুজ্জামান মানিক গত কয়েক মাস ধরে কারাগারে বন্দী আছেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে ৫৭(২) ধারায় চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ৷ আদালতে দেয়া এই চার্জশিটের ভিত্তিতে মামলার বিচার শুরু হবে শীঘ্র। পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘‘আমরা তার লেখায়, বইয়ে মহানবী ও ধর্মীয় অবমাননার প্রমাণ পেয়েছি৷ বাকি দু’জন তার অপরাধের সহযোগী৷’ অন্য একজন প্রকাশক রবিন আহসান জানান, ‘‘সরকারের সঙ্গে তার মুক্তির জন্য যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া পাইনি’।’ জামিনে থাকা প্রকাশনীর বিপণন কর্মকর্তা জানান, ‘‘আসলে আমরা বইমেলার সময় হুমকি পেয়ে শাহবাগ থানায় জিডি করতে গিয়েছিলাম৷ কিন্তু পুলিশ আমাদের উল্টো গ্রেপ্তার করে মামলা দেয়৷ জানিনা কবে এই মামলা থেকে মুক্তি পাব৷ পুলিশ ওই সময়ই প্রকাশনার অফিস সিলগালা করে দেয়, এখনো সিলগালা করা আছে৷” তথ্যপ্রযুক্তি আইনে তাদের বিরুদ্ধে যে ধারায় মামলা হয়েছে সে ৫৭ ধারার ২ উপধারায় বলা হয়, ‘‘কোনো ব্যক্তি উপধারা (১) এর অধীনে অপরাধ করিলে তিনি অনধিক চৌদ্দ বছর এবং ন্যূনতম সাত বত্‍সর কারাদণ্ডে এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন৷”

সূত্র-

http://www.dw.com/en/why-bangladesh-wants-to-silence-its-civil-society/a-35987962

http://www.sylhettoday24.com/news/details/Sports/31798?utm_campaign=shareaholic&utm_medium=facebook&utm_source=socialnetwork

http://www.dw.com/bn/%E0%A6%87%E0%A6%B8%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%AE-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95-%E0%A6%AC%E0%A6%87%E0%A7%9F%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%96%E0%A6%95-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A7%87-%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%9C%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%9F-%E0%A6%B6%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A7%81-%E0%A6%B9%E0%A6%9A%E0%A7%8D%E0%A6%9B%E0%A7%87-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%B0/a-36119306

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s