কবিতার রাজনৈতিক শক্তি

বাংলা সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন তার কবিতায় ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।’ জীবনের কঠিনতম মুহূর্তে যখন কেবলি প্রতিবন্ধকতা চারপাশে তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এ কবিতা আমাদের আশা জাগায়, অন্ধকারে পথ কেটে চলতে শেখায়।

কবিতা মানুষের ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করতে পারে, যা প্রচলিত পশ্চাদপর সমাজ বা একটি দেশ পরিবর্তন করতে পারে। কবি সত্যদ্রষ্টা, তিনি কবিতার মাঝে সত্যকে প্রকাশ করেন। যে কোন একটি ঘটনাকে কবিতা অনেক সময় যুক্তিবাদী আয়নায় যাচাই করে সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করে, তাদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জাগায়, তাদের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট করে। যেমন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি বলি, সেক্ষেত্রে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের আন্দোলন সংগ্রামে কবিতার ভূমিকা ছিল অনেক, কবিদের জ্বালাময়ী ব্যঙ্গ ও প্রতিবাদী কবিতা বাংলার মানুষদের উজ্জ্বীবিত করেছিল, বিট্রিশ শাসকদের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। একটি উদাহরণ দেয়া যাক– বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিট্রিশদের নিয়ে প্রতিবাদী কবিতা লেখায় তাকে অনেকবার কারাবরণ করতে হয়েছিল, তার একাধিক কবিতার বই হয়েছে নিষিদ্ধ, এ কারণে তাকে ‘বিদ্রোহী কবি’ উপাধি দেয়া হয়েছে। তার মানবতাবাদী কবিতা থেকে দু’টি পঙক্তি উল্লেখ করা যাক—

“মানুষের চেয়ে কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান ,

নাই দেশকালপাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি ‘’

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে আমরা মুক্তি পেয়েছিলাম, কিন্তু আমরা গিয়ে পড়েছিলাম পাকিস্তানের হাতে। ১৯৫২ সালের কথা বলা যায়। তখন বর্তমান বাংলাদেশ ছিল পূর্ব পাকিস্তান, অর্থাৎ বর্তমান পাকিস্তানেরই ১২০০ কিলোমিটার দূরে বিচ্ছিন্ন আরেকটি অংশ। তখন পাকিস্তানী শাসকেরা বলেছিল যে বর্তমান বাংলাদেশের মানুষ তাদের নিজ মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলতে পারবে না, তাদেরকে কথা বলতে ভিনদেশী ভাষায়, উর্দুতে যা ছিল পাকিস্তানের মাতৃভাষা। রাজপথে বাংলার মানুষ নেমে আসে প্রতিবাদে। পাকিস্তানী পুলিশ গুলি চালালে অনেকে নিহত হয়। এভাবে আমরা রক্ত দিয়ে ধরে রেখেছিলাম আমাদের মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার। যা নিয়ে বাংলাদেশের লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরী লেখেন একটি কবিতা—

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি

ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু গড়া এ ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি।’

শফিক, রফিক, সালাম, বরকত, জ্ব্বার—এ সকল ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি সম্মানের উদ্দেশ্যে সারা বাংলাদেশে নির্মিত হয় শহীদ মিনার। আজও ২১ শে ফ্রেবুয়ারির সকালে বাংলাদেশের মানুষ গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে সেসব শহীদদের, খালি পায়ে প্রভাতফেরিতে আপামর মানুষের ‍মুখে থাকে সুরারোপ করা এ কবিতা। ইতিহাসের সে ঘটনার ধারাবাহিকতায়, ২০০০ সালে জাতিসংঘ ২১ শে ফ্রেবুয়ারি দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করেছে, প্রতি বছর ২১ শে ফেব্রুয়ারি সারা বিশ্বে পালিত হয়। (তবে আজ নির্মম পরিহাস বলে মনে হয়: যে দেশের মানুষেরা মাতৃভাষা বাংলার জন্য রক্ত দিয়েছিলেন, সে দেশের সে ভাষার এ প্রজন্মের লেখকেরা প্রগতিশীল ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের পক্ষে লেখার জন্য গত ৩ বছরে (২০১৩-২০১৬ সালে) মোট ১৬ জন লেখক ও ব্লগার ইসলামী জঙ্গীদের হাতে প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।)

১৯৬৯ সালে পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশের) রাজধানী ঢাকায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন প্রতিবাদী ছাত্রনেতা আসাদ। তার এই আত্মত্যাগ তৎকালীন সেনাশাসনবিরোধী চলমান আন্দোলন বেগবান হয়েছিল। পরবর্তীতে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পতন হয় স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের। এ নিয়ে কবিতা লেখেন কবি শামসুর রাহমান, কেননা তিনি দেখেছিলেন সেদিন আসাদ নিহত হবার পর মিছিলে গণতন্ত্রকামী মানুষেরা আসাদেরা তার রক্তভেজা শার্ট লাঠির আগায় তুলে ধরে মিছিল করছে, শ্লোগান দিচ্ছে গণতন্ত্র চেয়ে।

luckyphotographer20001

এ কবিতাটির নাম ‘আসাদের শার্ট’। এ কবিতায় তিনি লিখেছেন—‘গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিংবা সূর্যাস্তের/জলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট/উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায়।/বোন তার ভায়ের অম্লান শার্টে দিয়েছে লাগিয়ে/নক্ষত্রের মতো কিছু বোতাম কখনো/হৃদয়ের সোনালি তন্তুর সুক্ষ্মতায়/বর্ষীয়সী জননী সে-শার্ট/উঠোনের রৌদ্রে দিয়েছেন মেলে কতদিন স্নেহের বিন্যাসে।/ডালিম গাছের মৃদু ছায়া আর রোদ্দুর-শোভিত/মায়ের উঠোন ছেড়ে এখন সে-শার্ট/শহরের প্রধান সড়কে/কারখানার চিমনি-চুড়োয়/গমগমে এভেন্যুর আনাচে কানাচে/উড়ছে, উড়ছে অবিরাম/আমাদের হৃদয়ের রৌদ্র-ঝলসিত প্রতিধ্বনিময় মাঠে,/চৈতন্যের প্রতিটি মোর্চায়।/আমাদের দূর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা/সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক;/আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।’

সকল অন্যায়-অবিচার-শোষণের বিরুদ্ধে কলম হল লেখকের যুদ্ধ করার হাতিয়ার। যেমন বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়, এবং সে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। সেসময় বাংলাদেশী অনেক লেখকেরা কবিতা লিখেছেন এবং তা প্রচারিত হয়েছে রেডিওতে। সেসব শুনে মুক্তিযোদ্ধারা হয়েছেন উদ্দীপিত। যেমন– কবি হেলাল হাফিজের কবিতা ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ বারবার প্রচারিত হয়ে সে সময়ে রেডিওতে। এ কবিতাটি এমন—’এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময় /মিছিলের সব হাত/কণ্ঠ/পা এক নয় ।/সেখানে সংসারী থাকে, সংসার বিরাগী থাকে,/কেউ আসে রাজপথে সাজাতে সংসার ।/কেউ আসে জ্বালিয়ে বা জ্বালাতে সংসার/শাশ্বত শান্তির যারা তারাও যুদ্ধে আসে/অবশ্য আসতে হয় মাঝে মধ্যে/অস্তিত্বের প্রগাঢ় আহ্বানে,/কেউ আবার যুদ্ধবাজ হয়ে যায় মোহরের প্রিয় প্রলোভনে/কোনো কোনো প্রেম আছে প্রেমিককে খুনী হতে হয়।/যদি কেউ ভালোবেসে খুনী হতে চান/তাই হয়ে যান/উৎকৃষ্ট সময় কিন্তু আজ বয়ে যায় ।/এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/ এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময় ।’ এ কবিতাটি সেসময়ে বাংলাদেশী তরুণদের উৎসাহিত করেছে, তারা দেশমাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করতে ঝাপিয়ে পড়েছে। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধারা যারা ছিলেন তারাও কবিতা লিখেছেন, সেসময়কার গোপন পত্রিকায় হাতে লিখে বা ছেপে মুদ্র্রিত হয়েছে, এসব কবিতাকে বলা হয় ‘রণাঙ্গনের কবিতা’।

মুক্তিযুদ্ধ যেসব আদর্শকে সামনে রেখে সংঘটিত হয়েছিল তা পূরণ হয়নি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি ছিল সেক্যুলার একটি দেশ গঠন যেখানে সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করবে, মানুষের বাক স্বাধীনতা থাকবে, দারিদ্র-বৈষম্য থাকবে না। কিন্তু তা হয়নি। মৌলবাদের চাষ শুরু হয়, মানুষের কণ্ঠ রোধ করা হয় স্বাধীন দেশে, সংখ্যালঘুদের ওপরে চলে নির্মম স্টিমরোলার। দাউদ হায়দার একজন বাংলাদেশী যুক্তিবাদী, মানবতাবাদী কবি যিনি ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ থেকে নির্বাসনের পর বর্তমানে জার্মানীতে নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন। তিনি তখন বাংলাদেশের একটি দৈনিক পত্রিকায় (সংবাদ) ‘কালো সূর্যের কালো জ্যোৎসায় কালো বন্যায়’ নামে একটি কবিতা লিখেছিলেন। ঐ কবিতাটি প্রকাশিত হলে বাংলাদেশে আবদ্ধ, ধর্মভীরু, পশ্চাদপর সমাজ বড় ধরনের নাড়া খায়, কেননা তারা এর আগে এ ধরনের লেখার সম্মুখীন হয়নি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে তিনি তার ঐ কবিতাটিতে বিভিন্ন ধর্মের নবীদের উদ্দেশ্যে তিরযক মন্তব্য করেছিলেন–

406209_10151479931078287_1531881604_n

285674_10151479930703287_1876412959_n

বাংলাদেশে মৌলবাদী গোষ্ঠী এর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করে, কবির ফাসি দাবী করে। কবির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। তৎকালীন সরকার এ কবিকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়। আর বাংলাদেশ সরকার তখন চায়নি আন্তর্জাতিকভাবে মুসলিম সরকারদের সাহায্য হারাতে। তাই কবিকে নিরাপত্তামূলক কাস্টডিতে নেয়া হয়। পরে ১৯৭৪ এর ২০ মে সন্ধ্যায় তাকে জেল থেকে মুক্তি দিয়ে পরদিন ২১শে মে সকালে বাংলাদেশ বিমানে কলকাতায় পাঠানো হয়, ওই ফ্লাইটে তিনি ছাড়া আর কোন যাত্রী ছিল না। তার কাছে সে সময় ছিল মাত্র ৬০ পয়সা এবং কাঁধে ঝোলানো একটা ছোট ব্যাগ (ব্যাগে ছিল কবিতার বই, দু’জোড়া শার্ট, প্যান্ট, স্লিপার আর টুথব্রাশ)।  ভারতে নির্বাসিত অবস্থায় ১৯৭৯ সালে তিনি ভারতে বাংলাদেশ দূতাবাসে নবায়নের জন্য পাসপোর্ট জমা দিলে তা বাজেয়াপ্ত করা হয়। জার্মানীর নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক গুন্টার গ্রাসের সহযোগিতায় ১৯৮৭ সালে তিনি ভারত ছেড়ে জার্মানীর বার্লিন শহরে যান এবং তারপর থেকে সেখানেই আছেন। উল্লেখ্য পাসপোর্ট না থাকায় তিনি বার্লিন যাত্রায় পাসপোর্টের পরিবর্তে জাতিসংঘের বিশেষ ট্র্যাভেল পাস ব্যবহার করেছেন।

এ কথা আগেও বলেছি: মুক্তিযুদ্ধের পরে বাংলাদেশ আদর্শ-নীতি ও বাঙালী জাতীয়তাবাদ থেকে বিচ্যুত হয়, ধনী-গরীব বৈষম্য বাড়তে শুরু করে। ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তখন এ নিয়ে কবিতা লেখেন কবি রফিক আজাদ। তিনি লেখেন:‘ভাত দে হারামজাদা, তা না হলে মানচিত্র খাব।’ এ পঙক্তি দু’টো বিখ্যাত হয়। এ কবি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ১৯৭১ সালে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে পাকিস্তানপন্থী সেনাদের হাতে নিহত হলে, বাংলাদেশ প্রায় ১৫ বছর বিভিন্ন সেনাশাসকের অধীনে ছিল। ১৯৭৫-১৯৯০। সেনাশাসনের পতনের জন্য জনমানুষের সংগঠিত আন্দোলনে ১৯৮৭ সালে ১০ নভেম্বরে সুবিশাল মিছিলের সবার সামনে ছিলেন এক অদম্য সাহসী বীর কালোবর্ণের, লম্বা টগবগে যুবক তার নাম ছিল নূর হোসেন। সেদিন তাঁর চোখে মুখে ছিল যেন আগুনের ফুলকি। বুকে-পিঠে লেখা ছিল গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি—দুটো কবিতার মতো পঙক্তি:‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক/ স্বৈরাচার নিপাত যাক।’ তাকে মিছিলে মানুষের ভিড়ে খুঁজে বের করে পুলিশ গুলি করেছিল, তিনি নিহত হন। পরে এ নিয়ে লিখেছিলেন কবি শামসুর রাহমান:‘“নূর হোসেনের বুক নয় বাংলাদেশের হৃদয়।’’ পরবর্তীতে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে শহীদ নূর হোসেনের মতো অনেক প্রতিবাদী আন্দোলনকর্মীরা বুকে পিঠে কবিতার পঙক্তি-শ্লোগান-গান ইত্যাদি লিখেছেন–

nur_hossin_

 

১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের মানুষের ৯ মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ বাংলাদেশীকে হত্যা করা হয় ও ৩ লাখ নারীকে ধর্ষণ করেছিল পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সঙ্গে মানবতাবিরোধী এ জঘন্য অপরাধে বাংলাদেশের ‘জামায়াতে ইসলামী’ নামের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল সক্রিয় অংশগ্রহণ করে। সে দলের সদস্যরা ছিল আমাদের নিজেরই দেশের মানুষ। তারা পাকিস্তানের অখন্ডতার নামে, তথাকথিত ইসলাম রক্ষার নামে এ ঘটনা ঘটায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে বাংলাদেশের মানুষ এসব ঘৃণিত ও চিহ্নিত রাজাকারদের শীর্ষ নেতাদের বিচারের দাবী তোলে, যারা এমনকি একসময় ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছিল এমনকি বাংলাদেশের সংসদ সংস্য, মন্ত্রী ও আইনপ্রণেতাও হয়েছিল। প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কবিরা এ পৈচাশিক শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ বজায় রাখে তাদের লেখায়। দীর্ঘ ৪ দশক ধরে তারা লিখে চলেছেন এ নিয়ে, এবং ইস্যুটিকে জিইয়ে রাখেন। সেনাশাসনের সময়ে (১৯৭৫-১৯৯০) সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের অপরাধ নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয় ও তাদের উত্থান ঘটে। কেউ তাদের দিকে আঙুল তুলে যখন ইতিহাস মনে করিয়ে দিতে পারতো না, সেই স্বৈরশাসক আমলে উপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ তার নির্মিত টেলিভিশন নাটকে তুলে আনেন এক পাখি চরিত্র যাকে বলতে শেখানো হয়– ‘তুই রাজাকার’। এভাবে ’তুই রাজাকার’ কথাটি ছড়িয়ে পড়ে। একে অবলম্বন করে পরে অনেক কবি-ছড়াকার ‘তুই রাজাকার’ নামে ছড়া ও কবিতা লেখেন, যার স্ফুলিঙ্গ খুব দ্রুত বাঙালীর মনে ছড়িয়ে যায়। বিজয়ের ৪০ বছর পর বাংলাদেশে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আনুষ্ঠানিকভাবে চলছে। একাধিক যুদ্ধাপরাধী চরম দণ্ড পেয়েছে। এ ফল একদিনে আসেনি, মুক্তিযুদ্ধের পর ধারাবাহিক আন্দোলন ছিল যার রূপরেখা। সেখানে বারবার কবিতা, গান, পথনাটক, টিভিনাটক বারবার হাতিয়ার হয়ে  উঠেছে।  যেমন ইমতিয়াজ বুলবুলের একটি কবিতার/গানের কথা মনে পড়ছে—

‘একাত্তরের মা জননী, কোথায় তোমার মুক্তি সেনার দল।
যারা অস্ত্র হাতে ধরেছিলো,
মাগো তোমার তরেই মরেছিলো।
ও মা যাদের ভয়ে পালিয়েছিলো শত্রু
সেনার দল।’

এছাড়া কবিরা কবিতায় নিজ শেকড়ের কথা বারবার ফিরিয়ে আনেন, মানুষকে মনে করিয়ে দেন স্বদেশপ্রেমের কথা, গণতন্ত্রের কথা, মানবিকতার কথা, মানুষের অধিকার আদায়ের কথা, বৈষম্যহীন যুদ্ধহীন সুন্দর একটি পৃথিবীর কথা যা আগামী প্রজন্মের জন্য অধিকতর বাসযোগ্য হবে। আমরা এভাবেই শেকড় ভুলিনা, আন্দোলন ভুলি না। পেছনের ইতিহাস মনে রাখি আগামী দিনের কথা ভেবে।

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s