হাতকড়া ও হাতব্যাগ, বিচারবৈষম্যের প্রতীক

016378092_30200

কোনো এক দেশে ছিলেন এক প্রধানমন্ত্রী। তিনি একবার করলেন কি, বিদেশী রাষ্ট্রদূতের চুরি হওয়া হাতব্যাগ বেমালুম প্রায় ২৪ ঘন্টার মধ্যে  খুঁজে এনে দিলেন। অন্যদিকে তিনি হাতকড়া পড়ালেন ছাত্রনেতাদের হাতে, প্রকাশকদের হাতে। এবং তার সান্ত্রী বললো তারা বেডরুমে বেডরুমে নিরাপত্তা দিতে পারবে না। মানে বাসররাতের নিরাপত্তা অন্য কেউ দিতে পারবে না, কথাটি ইঙ্গিতে বুঝালেন। অন্যদিকে আছে তার সৈন্যচেলাচামুণ্ডারা তারা এতদিন করলো টেন্ডারবাজি। টেন্ডারিবাজি করে তারা বেশ ট্যাকাটুকা কামালো। কেননা বর্তমান সরকার ৮ বছর ধরে ক্ষমতায় আছে। এতোদিনে রাজনৈতিক নেতাদের অনেকে ট্যাকাটুকার মালিক হয়ে গেছে। এখন তাদের দরকার যাকে পছন্দ তাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়া, রাজি না হলে কুপানো বা ধর্ষণ।

সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর জমিজমা ভোগদখল করতে বেশ আরাম। সেগুলো বেশ উর্বর। হাজার বছর ধরে সে মাটিতে গোবর পড়তে পড়তে তাতে ভিটের বাগানে নানা ফল ফলে, পুকুরে মাছ, গোয়ালে গরু। কেননা তারা বাছুর বড় হলে গরু বেঁচা ব্যবসা করে না। তাছাড়া আছে সংখ্যালঘু ঘরের ডাগর চোখের সুন্দরী মেয়ে, যাকে স্বর্গসুখ দেয়া মানে বেহেশতের ঠিকানা দেয়া তথাকথিত ঈমানী কর্তব্য।

সাঁওতাল-আদিবাসীরা! আরে সকলে তো এতদিন সংখ্যালঘু বলতে এতদিন হিন্দু বুঝতো। কিন্তু সাঁওতালদেরও যে কয়েক হাজার একর জমি আছে। এখন এ আধুনিক যুগে ওরা যে কেন আপন সংস্কৃতি ধরে রেখেছে! এটা মানানসই না। তাহলে ওদের বাড়িঘর আগুন লাগিয়ে তাড়াতে হবে। তাতে ওরা বিচ্ছিন্ন হয়ে আস্তে আস্তে মূল জনস্রোতের সঙ্গে মিশে যাবে, ল্যাংটি পরে সামনে সামনে ঘুরবে না। পুলিশ প্রোটেকশনে মিল শ্রমিকের ছদ্মেবেশে গুন্ডারা গিয়ে জ্বালিয়ে দিল তাদের পাড়া, ৩জন পুলিশের গুলিতে খুন। বাঃ! আমাদের প্রধানমন্ত্রী তখন রাষ্ট্রদূতের চুরি যাওয়া হাতব্যাগ খুঁজতে ব্যস্ত। এই তো ক্ল পাওয়া যাচ্ছে…

তিনি ব্যস্ত কেননা তাতে মান যাবে দেশের। নেদারল্যান্ড মতো দেশের রাষ্ট্রদূতের ব্যাগ চুরি! ক্কী! হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক শুনছেন! দেশীয় চোরেদের আর আক্কেল হলো না! যে দেশে অপরাধীর অভাবে কারাগার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সে দেশের রাষ্ট্রদূতের হাতব্যাগ চুরি! খেলা কথা না! ইসলামী আইন অনুযায়ী এ চোরের হাত কেটে নেয়া দরকার। সে না হোক, সুশীল সমাজ কেউ কেউ করবে তারচে চোরকে ধরে নেদারল্যান্ডের জেলে মানে চিড়িয়াখানায় পাঠানো দরকার। তাই না! হ্যাঁ, হ্যাঁ, সে কারণে তো সর্বশক্তি দিয়ে প্রশাসন খেটে চলেছে চোর ধরার জন্যে। ধরে বাঞ্চোতকে এমন প্যাদান হবে যে নড়তে পারবে না। কেননা এমনিতে মাঝে মাঝে বিভিন্ন দেশ জঙ্গী আক্রমণের ভয়ে গোয়েন্দা সূত্রে খবর পেয়ে বাংলাদেশ ভ্রমণে সতর্কতা সঙ্কেত জারি করে, তার উপরে আবার এ ‍চুরি।

নেদারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূতের বাংলা ৫ আকারের এক কিম্ভূতকিমাকার চেহারার ছবি প্রকাশিত হয়েছে। দুঃখিত, বিষণ্ন। হয়তো গুরুত্বপূর্ণ মালমশলা ছিল ব্যাগে। তাই আমাদের প্রধানমন্ত্রী উদ্বিগ্ন। কিন্তু ওদিকে কেঁদে চলে আমার দেশের মানুষ অন্যায়-অবিচারের শিকার হয়ে। গত সপ্তাহে  কলেজ জাতীয়করণের দাবী জানানো রত অবস্থায় পুলিশের নিপীড়নে একজন কলেজ শিক্ষক নিহত হলেন, তাতে চুপ করে থাকে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন। কেননা তারা মাঝে মাঝে সরকারী সংস্থার ‍অপরাধের বিরুদ্ধে দু-একটা উচ্চবাচ্য করে ক্যামেরার সামনে হাসির খোরাক তৈরি করে। মাঝে মাঝে ‘পুতুল নাচের নাট্যশালায়’ হাস্যরসের দরকার হয়।

VectorPortal-Handcuffs-Vector.jpg

হাতকড়া শুধু ছাত্রনেতাদের হাতে নয়, মুক্তচিন্তা প্রকাশকারী প্রকাশকের হাতে নয়, হাতকড়া মানবিকতার হাতে। যেমন সন্ত্রাসীদের আক্রমণে এক পা হারানো ৫৭ ধারার আসামী সাংবাদিক প্রবীর শিকদারকে হাতকড়া পরিয়ে নেয়া হয় আদালতে। অথচ আদালত থেকে পালিয়ে যায় ধর্ষণ মামলার আসামী, যাকে পরানো হয়নি কোন হাতকড়া।

বলা হল ৪৮ ঘন্টার মধ্যে সাংবাদিক দম্পতির খুনীরা গ্রেফতার হবে। তারপরে কত ৪৮ চলে গেল, কিছু হলো নে। কিন্তু তার চেয়েও কম দ্রততম সময়ে রাষ্ট্রদূতের ব্যাগ খুঁজে এনে দেয়া হল।  দেশের মোট জনসংখ্যার ১৬ কোটি মানুষের মাঝে ১০ কোটি মানুষ দারিদ্রতার হাতকড়া পরে আছে। লুটেরা রাজনীতি ও তার চর্চাকারী লুম্পেনরা টাকার পাহাড় করেছে। সাধারণ জনগণকে বাঁধা হয়েছে উচ্চ ট্যাক্সের হাতকড়ায় আর ঋণখেলাপীদের দেয়া হয়েছে কোটি কোটি টাকা ঋণ। অথচ সে ঋণের টাকা জনগণের ট্যাক্সের টাকা।

এ বছরে ৩০টির বেশি জেলায় সংখ্যালঘুদের ওপরে একক বা একাধিক আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। কোন সুরাহা হয়নি। বরঞ্চ সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংক্রান্ত শেষ পেরেকটি মারা গেছে, যে কারণে আত্মগর্বে গরিয়ান তার এক সান্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংবিধানে একটি মীমাংসিত বিষয়। বেড়ে চলেছে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা, ঢাকায় কর্মজীবী মানুষের সাজিতে করে ঘুমানোর দৃশ্য প্রধানমন্ত্রীর চোখে পড়ে না, কেননা তার গাড়িবহরের পাশে কোন ভিক্ষুকরা বা ঝুঁকিতে থাকা কোন মেয়ে শিশু ফুল বিক্রি করতে যেতে পারেনা, সেটা তার নিরাপত্তার প্রশ্ন।

উরুগুয়ের প্রধানমন্ত্রী সরকারী হাসপাতলে বসে চিকিৎসা নেন সে গাাঁজখুরি গল্প বিশ্বাস করবেন না! চিকিৎসা খাত  সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে, শিক্ষার মান দিন দিন অধঃপতিত, এসব ঠিক না করে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আধুনিকীকরণের নামে আরো সামরিকীকরণে ব্যস্ত। কেননা তাদের হাতে অস্ত্র আছে, তাদের খুশি রাখতে হয়। ছোট্ট একটি দেশের জন্য এতবড় সেনাবাহিনী কোনো চুলায় লাগে না, তা দেখলে মনে হয় না যে আমার দেশ এত দরিদ্র।

উহু! কোন প্রশ্ন করা যাবে না। আমি আমার এ সম্পূর্ণ লেখাটিতে কোন প্রশ্ন করিনি। শুধু বলতে চেয়েছি ওই হাতব্যাগ ও হাতকড়া বর্তমান বাংলাদেশে বিচারবৈষম্যের সবচে বড় প্রতীক হয়ে উঠেছে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s