স্বাধীনতাবিরোধী বইয়ের গন্ধ শোঁকা কমিটি ও কিছু কথা

c014e5263f65c35f9c529e51a80da0a5-58c175d477834
কবি শামসুর রাহমানের মতো কোন সাহসী কবি এখন নেই, যিনি লিখতে পারতেন ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’ এর মতো নতুন কোন পঙক্তি।
আমি কোন প্রকার বই নিষিদ্ধের সমর্থন করি না। তাহলে তো আগে ধর্মগ্রন্থগুলোকে নিষিদ্ধ করতে হয়। কিছুদিন আগে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদ অবশ্য নিষিদ্ধ করেননি, তিনি ইসলামী আলেম-ওলামাদের সাহায্য নিয়ে কোরানের কিছু উগ্র আয়াত বিয়োজন করে কোরানের নতুন ও গ্রহণযোগ্য সংস্করণ প্রকাশ করেছেন। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আজকের ধর্মগ্রন্থগুলো নানা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংযোজন ও বিয়োজনের মধ্য থেকে আজকের অবস্থায় এসেছে। থাক সেসব কথা। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আসি।
মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাজাপ্রাপ্তদের রচিত সব ধরনের প্রকাশনা নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা করছে সরকার। এ বিষয়টি আমি কোনভাবে সমর্থন করি না। এসব বই নাকি নিষিদ্ধ করা হবে সমাজে শান্তিভঙ্গ, ধর্ম অবমাননা, মুক্তিযুদ্ধ ও দেশের ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগে এবং সেসব বই প্রকাশনা ও বাজারজাত বন্ধ করা হবে। সরকারের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নাকি জামায়াত-শিবিরের পাঠ্যতালিকা, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের রচিত বইও নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বাজার থেকে তুলে নিতে হবে অভিযুক্ত গ্রন্থগুলো। এর পক্ষে সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতামত হল: জামায়াত-শিবিরসহ উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো স্বাধীনতাবিরোধীদের লেখা পড়েই মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়। এতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাদের ভুল ও বিভ্রান্তিমূলক রচনা পড়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এসব বিবেচনা করে স্বাধীনতাবিরোধীদের লেখা নিষিদ্ধ করবে সরকার।
সরকার আসলে গোড়ায় হাত দিচ্ছে না। যেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের মতো আইন করা দরকার, জামাতের মতো উগ্রপন্থী দলগুলোকে রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করা উচিত, হেফাজতকে রাস্তা থেকে হটানো উচিত, যেখানে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে আস্তে আস্তে ছাত্রদের সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় একত্রীভূত করার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেয়া উচিত, যেখানে জামাতের ফান্ডিং বন্ধ করার জন্য সরকারের ইসলামী ব্যাংক ও বীমাগুলোর প্রতি নজরদারি বাড়ানো উচিত, সেখানে সরকার প্রকাশনা জগতের ওপর পুরোপুরি সেন্সরশিপ আরোপের চেষ্টা করছে।
এ ধরনের প্রকাশনা ব্যান হলে কাগুজে প্রকাশনা থেকে পিডিএফ এর মাধ্যমে ইন্টারনেটেও ছড়িয়ে পড়বে। আজ ইন্টারনেটের যুগে এভাবে কি বইয়ের বাজারজাত বন্ধ করা সম্ভব?
বাংলাদেশ ৯০ এর দশকে গণতন্ত্রে পুনরুত্থানের পরে গত প্রায় এক দশকে বর্তমান সরকারের আমলে সবচে বেশি মাত্রায় সরকারি সেন্সরশিপের স্বীকার হয়েছে। বই-সিনেমা-কার্টুন নিষিদ্ধ সহ ইন্টারনেটের বাক স্বাধীনতা হরণকারী ও সেলফ সেন্সরশিপ আরোপকারী কালো আইন আইসিটির ৫৭ ধারা তৈরি করে তার শিকার করা হয়েছে মানুষকে, ব্লগার-প্রকাশককে কারাবন্দী করা হয়েছে; গত ২২ আগস্ট সম্প্রচার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে অপপ্রচার চালালে বা তাতে মদদ দিলে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় শাস্তির বিধান রেখে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৬’-এর খসড়ার অনুমোদনও দেয় মন্ত্রিসভা। গেলবার বাংলা একাডেমি গ্রন্থমেলায় পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয় তথাকথিত ধর্মবিরোধী উপাদান সম্বলিত বইয়ের খোঁজে। ধারণা করা হচ্ছে নতুন প্রস্তাবিত এ খসড়া আইন হিসেবে বাস্তবায়িত হলে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী বইয়ের খোঁজে কাজ করবে যৌথভাবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো, বইয়ের গ্রন্থ শুঁকবে সরকারি বুদ্ধিজীবী-লেখকরা, তারা বইয়ের গন্ধ শোঁকা কমিটির সদস্য হিসেবে নির্দেশ জারি করবে প্রশাসনের প্রতি সংশ্লিষ্ট গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করতে, প্রকাশনা সংস্থা বন্ধ করে দেয়া হবে ও লেখককে ধরে আনা হবে কোমরে রশি বেঁধে। হয়তো ‘বইয়ের গন্ধ শোঁকা কমিটি’র প্রধান হবেন বাংলা একাডেমির বর্তমান মহাপরিচালক; তিনি আইন লঙ্ঘন করে মেয়াদ বাড়িয়ে মহাপরিচালক আছেন। মুক্তচিন্তা রোধে তার ভূয়সী ভূমিকা প্রশংসিত সরকারী মহলে। তার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবার আগে হয়তো তার জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র খোলা হচ্ছে। ‘বইয়ের গন্ধ শোঁকা কমিটি’ হতে পারে তার পরবর্তী কর্মস্থল!
অথচ যাদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে স্বাধীনতাবিরোধিতার অভিযোগ ছিল এমন কোন ব্যক্তি এখনও ক্ষমতাসীন সরকারের বন্ধু হিসেবে আছেন, একাধিক ব্যক্তি পেয়ে গেছেন রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন পুরুস্কার যেমন শর্ষিনা পীরের স্বাধীনতা পদক। সে সব প্রত্যাহারে সরকারের কোন উদ্যোগ নেই। উদ্যোগ নেই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে সীমাহীন দুর্নীতি বন্ধের।
হেফাজতের দাবী অনুযায়ী পাঠ্যপুস্তক থেকে গল্প-কবিতা বাদ দিয়ে পাঠ্যপুস্তককে সাম্প্রদায়িক করা হয়েছে। ‘উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ!’
আমি শুধু ভাবি, স্বাধীনতার দলিল নামের বিশাল বিশাল খন্ডগুলো, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অসংখ্য বইগুলো কি গুটিকয়েক স্বাধীনতাবিরোধী বইয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে পারছে না? মানুষের মেধা কতোটা নিম্নদিকে ধাবিত হলে রাজাকারদের লেখা বই বিক্রি হয়, নতুন সংস্করণ বের হয়, ছড়িয়ে পড়ে ঘরে ঘরে বিদ্যুতগতিতে, সমাজকে কলুষিত করে?

লিঙ্ক: http://www.banglatribune.com/national/news/187491/%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%B7%E0%A6%BF%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7-%E0%A6%B9%E0%A6%9A%E0%A7%8D%E0%A6%9B%E0%A7%87-%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%88%E0%A6%A6%E0%A7%80%E0%A6%B8%E0%A6%B9-%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A7%E0%A7%80%E0%A6%A8%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A7%8B%E0%A6%A7%E0%A7%80%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%96%E0%A6%BE

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s