বৈশাখী জ্বালা

boishak-1.jpg

`দাদা পায়ে পড়ি রে

মেলা থেকে বউ এনে দে’

জনপ্রিয়তা পেয়েছিল গানটা। আমার ছেলেবেলায় পহেলা বৈশাখে রাস্তায় বেরুলেই এই গানটি কানে ভেসে আসতো। তখন ভাবতাম মেলায় বউ পাওয়া যায়। আমারও একটা বউ চাই। খুব আগ্রহ আর উৎসাহ নিয়ে মেলায় যেতাম। আর মাটির ঢেলা দিয়ে তৈরি মাটির বউ কিনে নিয়ে খুশিমনে বাড়ি ফিরতাম। একটু বড় হওয়ার পরে সকালবেলা বের হয়ে যেতাম মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করতে। হরেক রকম মুখোশ পরে নগরীর এক প্রান্ত থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয়ে অন্য প্রান্তে গিয়ে শেষ হত। সকল মানুষের মঙ্গল আর সমৃদ্ধি কামনা করে সমাজের সব শ্রেণীর মানুষ বর্ষবরণের এ মঙ্গল শোভাযাত্রার অংশগ্রহণ করে। এখন বাংলা বর্ষবরণ উৎসবে মঙ্গল শোভাযাত্রা অন্যতম মাত্রা যোগ করেছে এবং নবতর সার্বজনীন সংস্কৃতি হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। গৌরবের কথা, ২০১৬ সালের ৩০শে নভেম্বর বাংলাদেশের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে জাতিসংঘের ইউনেস্কো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান দিয়েছে।

‘মুসলমানের দেশে মঙ্গল শোভাযাত্রা চলবে না’–ইসলামী ঐতিহ্য সংরক্ষণ কমিটির বিক্ষোভ শিরোনামে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এ খবর ছাপা হয়েছে ক’দিন আগে। শুধুমাত্র এ বছরই নয়, কয়েক বছর ধরেই বাঙালির সার্বজনীন প্রাণের বর্ষবরণ উৎসব পহেলা বৈশাখকে অপসংস্কৃতি ও হিন্দুয়ানি আখ্যায়িত করে প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছে দেশের ভেতরে একটি দুষ্ট গোষ্ঠী। বাংলা সংস্কৃতি ধ্বংস করে দিয়ে ধর্মীয় সংস্কৃতিকে সার্বজনীন করার ষড়যন্ত্রে তারা লিপ্ত। আমাদের দেশে অনেক ধর্মের মানুষ বাস করলেও আমরা বিশ্বাস করি যে, আমাদের সকলেই বাঙালি, আমাদের মাতৃভাষা বাংলা এবং আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি সার্বজনীন; আমরা বাংলাদেশী। যারা ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান পহেলা বৈশাখ পালনকে ঠিক নয় বা পাপ বলে মনে করে, মঙ্গল শোভাযাত্রা বন্ধ করতে তারা এত উদগ্রীব কেন? তারা বলেছে মঙ্গল শোভাযাত্রায় যেসব পশুপাখির প্রতিকৃতি ব্যবহার করা হচ্ছে ওগুলো নাকি আমাদের দেশের পশুপাখী নয়, ওগুলো হিন্দু দেব-দেবীদের বাহন। পশুপাখিদেরও ধর্ম আছে আগে কখনো শুনিনি, এ যুগে এমন কথা শুধু স্বাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন লোকেও বলে না!

কেউ তো আর কাউকে বাংলা সংস্কৃতি বা উৎসব পালন করতে বাধ্য করছে না। মঙ্গল শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত পেঁচা, ময়ূর, বাঘ, দোয়েল, হরিণ, নৌকা ইত্যাদি প্রতিকৃতিমূলক শিল্পকর্ম দেখে যদি কারো জাত বা ধর্ম চলে যায় তবে তারা বাঙালি ও বাংলাদেশী পরিচয় প্রকাশের পূর্বে একটু ভেবে নিক যে তাদের আত্মপরিচয় কি! ধর্ম নয়, আমরা বাংলা মায়ের সন্তানেরা আমাদের বাঙালী পরিচয় নিয়ে গর্বিত।

** ছবি: চট্টগ্রামের চারুকলা ইনস্টিটিউটে বৈশাখী দেয়ালচিত্রে রাতের অন্ধকারে পোড়া মবিল লেপটে দেয় মৌলবাদীরা।

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s