নয়ন খাঁ মঙ্গল শোভাযাত্রায় যে পাঞ্জাবিটি পরবে

1-18

মাত্র কয়েকদিন পরেই পহেলা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষ। নয়ন হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছায় শপিং কমপ্লেক্সের সামনে। একটু থামে, পকেটে হাত দিয়ে দেখে টাকা ঠিক আছে তো! টাকা হারিয়ে ফেলার বাতিক আছে নয়নের। নাহ! টাকা ঠিকই আছে। এক হাজার পাঁচশত টাকা মানিব্যাগে ঠিকই আছে। সারা বছর টাকা জমায় নয়ন এই বিশেষ দিনটির জন্য। পুরাতন বছরটিকে পেছনে ফেলে নতুন বছরকে বরণ করে নেবার প্রস্তুতি নেয় নয়ন। প্রতি বছর নববর্ষে একটি নতুন জামা তার চাই। দোকান ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে নয়ন। এবারে ঢোল আঁকা একটি পাঞ্জাবি তার পছন্দ হয়েছে। বারোশত টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে খুশিমনে বাড়ির পথে রওয়ানা দেয় সে। পহেলা বৈশাখ দিনটি কেমনে করে কাটাবে এ নিয়ে বেশ ক’দিন ধরেই পরিকল্পনা আঁটছিল মনে মনে। নতুন পাঞ্জাবির ব্যাগ হাতে এসে দাঁড়ায় দরজায়, কলিংবেল বাজাতেই বড় চাচা দরজা খুলে দেন। ঘরের ভেতরে ঢুকে প্যাকেট খুলে পাঞ্জাবিটা দেখতে থাকে আর মনে মনে পুলকিত বোধ করে। রাতে খাবার টেবিলে বসে বড় চাচা জিজ্ঞাসা করেন,

—‘কী কিনে আনলে?’
—‘পাঞ্জাবি।’
—‘হঠাৎ পাঞ্জাবি কিনলে?’
—‘পহেলা বৈশাখে পাঞ্জাবি পরে মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করবো’, বলল নয়ন।
—‘ওসব হিন্দুয়ানি কালচার এ বাড়িতে চলবে না। কে তোমাকে অনুমতি দিয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রায় যাওয়ার?’ খুব জোরে চিৎকার করে এ কথাগুলো বলছিলেন বড় চাচা। মুহূর্তেই খাবার টেবিলের পরিবেশ নিঃশ্চুপ গম্ভীর হয়ে যায়। চাচা এবার কণ্ঠস্বর নামিয়ে নিয়ে শান্ত গলায় বললেন, ‘আগে খাওয়া শেষ করো, তারপরে সবাই বৈঠকখানায় এসো, আজ তোমাদের সকলের সাথে কিছু কথা বলবো।’

রাত প্রায় এগারটা। সবাই বৈঠকখানায়। নয়ন সেখানে অনুপস্থিত। তাকে ডেকে পাঠানো হলো। বাড়ির সবাই এশার নামাজ পড়ে রাতের খাবার একসাথে বসে খায়, এটা খাঁ বাড়ির নিয়ম, রাত দশটার মধ্যে বিছানায় ও ফজরের ওয়াক্তে ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়া। নয়ন এসে বৈঠকখানায় ঢুকতে বড় চাচা তাকে ডেকে কাছে বসান। এর পরে তিনি বলতে শুরু করেন—

‘আমরা মুসলমান, আমাদের পহেলা বৈশাখ পালন করা হারাম। ইসলামের দৃষ্টিতে নওরোজ বা যে কোন ধরনের নববর্ষ পালন করা হারাম ও বিদ্য়াত। হজরত ইমাম আবু হাফস কবীর রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, নওরোজ বা নববর্ষ উপলক্ষে যদি কেউ একটা ডিমও দান করে তার ৫০ বৎসরের আমল থাকলে তা বরবাদ হয়ে যাবে। অর্থাৎ নওরোজ বা নববর্ষ পালনের কারণে তার জিন্দেগীর সমস্ত আমল বরবাদ হয়ে যাবে। যে ব্যক্তি নওরোজের দিন এমন কিছু খরিদ করল যা সে পূর্বে খরিদ করত না, এর মাধ্যমে সে যদি ঐ দিনকে সম্মান করতে চায় তাহলে সে কাফের হয়ে যাবে। হাম্বলি মাযহাবের ফিকাহর গ্রন্থ ‘আল-ইকনা’ তে বলা হয়েছে–“কাফিরদের উৎসবে যোগদান করা, সেই দিন উপলক্ষে বেচা-বিক্রি করা ও উপহার বিনিময় করা হারাম”। বর্তমানে পঞ্জিকা বা ক্যালেন্ডারে মোট ৩টি সন গণনা পদ্ধতি চালু আছে। হিজরী বা আরবী সন, বাংলা বা ফসলী সন ও ইংরেজি বা গ্রেগোরিয়ান সনটি। মুসলমানদের জন্য অবশ্যই পালনীয় হিজরী বা আরবী সন। বৈশাখ শব্দটি এসেছে বিশাখা নক্ষত্রের নাম অনুসারে পয়লা বৈশাখ বা পহেলা বৈশাখ (বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস বৈশাখের ১ তারিখ) বাংলা সনের প্রথম দিন, তথা বাংলা নববর্ষ। মুসলমানের প্রিয় নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতের পর মদীনা শরীফ গিয়ে ঐ এলাকাবাসীর দুটি উৎসব বন্ধ করেছিলেন। একটি হচ্ছে, বছরের প্রথম দিন উদযাপন বা নওরোজ; অন্যটির নাম ছিলো ‘মিহিরজান’। এ উৎসবের দু’টির বিপরীতে চালু হয় মুসলমানদের দুই ঈদ। (তাফসিরসমূহ দেখতে পারেন) মূলত: নওরোজ বা বছরের প্রথম দিন পালন করার রীতি ইসলামে নেই, এটা পার্সী মজুসীদের (অগ্নিউপাসক) অনুকরণ। এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে আছে: “যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণ করে সে তাদের দলভুক্ত।” তাই যে কোন নওরোজ সেটা থার্টি ফাস্ট নাইট হোক, পহেলা নববর্ষ হোক কিংবা পহেলা মুহররম হোক, বিজাতীয় রীতি হিসেবে প্রতেকটি ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সকল ইসলাম বিরোধী কাজ থেকে মুসলমানদের বিরত রাখা অর্থাৎ মুসলমানদেরকে ইসলাম পালনে উৎসাহিত করে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা প্রত্যেক মুসলমানের নৈতিক কর্তব্য ও প্রধান দায়িত্ব।’

বড় চাচার বক্তব্য শেষ হলে নয়ন নিজের রুমে চলে আসে। বিছানায় শুয়ে থাকে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে। ওর চোখ জলে ঝাপসা হয়ে ওঠে। সে বুঝতে পারে না, ইসলাম ধর্ম আর তার বাংলা সংস্কৃতি পালনের বিরোধটা কোথায়? বালিশে মাথা রেখে নয়ন ভাবতে থাকে আর দু’চোখ গড়িয়ে পড়া জলে ভিজে যায় বালিশ। রাগে ফুঁসতে থাকে মনে মনে, শব্দ করে মুখ ফুটে কিছুই প্রকাশ করতে পারে না। বুকের ভেতরে কেমন জানি অস্থির লাগছে, অসহায়ের মত সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আনমনে একা একাই কথা বলতে শুরু করে।
—বাংলা নববর্ষ পালন যদি হারাম বা বিদআত হয় তবে বাংলা ভাষায় কথা বলা কেন হারাম নয়!
—বিশাখা নক্ষত্রের নামে বৈশাখ মাসের নাম রাখা হয়েছে। বিশাখা নক্ষত্রও তো সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি। সৃষ্টিকর্তা যদি এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করে তবে তার সৃষ্টিকে সে নিজেই কেন অপছন্দ করে!
—বাঘ, মাছ, ময়ূর, হরিণ, হাতি–বনের সব পশুই তো সৃষ্টিকর্তারই সৃষ্টি তবে ওগুলোর প্রতিকৃতি বানানো নিষেধ কেন?

—গান বাজনা নিষেধ কেন? গান শুনলে বা গাইলে কার কি ক্ষতি হয়! ক্ষতি না হলে নিষেধ কেন?
—সৃষ্টিকর্তা নিজের তো শিল্পের কারিগর; তবে তার সৃষ্টি আশরাফুল মাখলুকাতকে শিল্পী হতে কেন নিষেধ করেছে?
—বাঙালি সংস্কৃতি নববর্ষে পালন করে যদি মানুষ আনন্দ পায় তাহলে সৃষ্টিকর্তার বা অন্য কোন জীব-জন্তু-জানোয়ারের ক্ষতি হয়? অথবা পৃথিবীর?
—মুসলমানের যদি কোরান হাদীসের আলোকে ইসলামিক রীতিনীতি আইন কানুন মেনেই যদি বেঁচে থাকতে হয় তবে আমরা মুসলমানেরা বিভিন্ন ভাষায় কথা বলি কেন? কেন আমরা এদেশের সংস্কৃতি অনুযায়ী ভাত, মাছ, গোশত, তরকারী খাই?
—যদি আমরা আরবী ভাষায় নামাজ পড়ি তবে তো বাংলা ভাষা ব্যবহার করা বিদআত!

নয়ন আর ভাবতে পারছে না, মাথা ভারী হয়ে আসছে। এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে নয়ন। পরেরদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে পাঞ্জাবিটা রেখে আসে বন্ধুর বাড়িতে। এখান থেকেই বন্ধুর সাথেই সে মঙ্গল শোভাযাত্রায় যাবে। বাড়ির কাউকে সে জানতে দেবে না। নয়নের চোখে স্পষ্ট ভেসে ওঠে অনেক অনেক মানুষের সাথে মিছিলে সেও একজন বাঙালি। নতুন পাঞ্জাবির ঘ্রাণ নাকে লাগে। দিন বদলের হাওয়ায় নববর্ষের ভোরে নয়নেরা জন্ম দেবে নতুন নয়নের।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s