ধর্ষিতা নারীকে শারীরিক শাস্তি দেওয়ার মত জঘন্য অপরাধ দেখেও চুপ থাকবো?

19989509_1597052260307222_4985147240407767321_n

 

প্রথমে বলে নিচ্ছি আমি পুরুষ বলে কুণ্ঠিত নই। ধর্ষণের ঘটনা ঘটার পর পর আমার অনেক পুরুষ বন্ধুকে বলতে দেখি তারা পুরুষ বলে নাকি লজ্জ্বিত। যাহোক, পত্রিকার পাতায় খবরটি দেখলাম, চমকে উঠলাম। ধর্ষিতাকে পেটানো হচ্ছে, তাকে ঘিরে চলছে উল্লাস। এ অবশ্য নতুন কোন চিত্র নয় বাংলাদেশে। তবু শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ বলে চমকে উঠি, ভয় পাই। ভয় পাই এসব মানুষকে নয়, ভয় পাই এ ভোঁতা সময়কে। যখন মানুষের অনুভূতিতে গুরুতর অপরাধকে লঘু বলে মনে হয় আর অথচ বিবেকবোধ তা ক্রিয়া করে না।

দৈনিক কালের কণ্ঠে প্রকাশিত গ্রাম্যবিচারের ছবিটিতে আমি চুপচাপ মুখগুলোকে দেখি। তাদের বয়স বোঝার চেষ্টা করি। সে দলে কিশোর থেকে শুরু করে মাথায় টুপি পরা মুসুল্লি ব্যক্তিটিও আছেন। এবং তাদের চোখে কী যে আনন্দের অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে তার বর্ণনা করা হবে পৈশাচিক। কিন্তু সত্যি তাদের মুখে আনন্দ, অভিব্যক্তিতে রিল্যাক্স ভাব, যেন গ্রাম্য যাত্রাপালার কোন নাটক চলছে। কিন্তু শনিবারের গ্রাম্যবিচারের ঘটনাটি দিনের আলোর মতো সত্য।

ঘটনাটি টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুরের। গত শুক্রবার রাতে সেখানকার মীরনগর গ্রামে ধর্ষণের স্বীকার হন এক নারী। সে ধর্ষক তারই প্রতিবেশি। তারমানে সে এতদিন সুযোগ খুঁজছিল। স্থানীয় লোকজন ঘটনা টের পেলে ধর্ষক ঐ নারীকে পাটক্ষেতে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। ধর্ষিতা নারীকে স্থানীয় ইউপি সদস্য হেলালউদ্দিনের জিম্মায় রাখা হয় সে রাতে। পরের দিন গ্রাম্য সালিশ বসে। হাজির করা হয় ধর্ষক সিরাজ মিয়াকেও। গ্রাম্য বিচারে ধর্ষক ও ধর্ষিতাকে দেয়া হয় শারীরিক শাস্তি বা দোররা। এবং উভয়কে করা হয় অর্থদণ্ড জরিমানা। জরিমানার ৩৫ হাজার টাকা স্থানীয় ক্লাবঘরের খরচ নির্বাহে ব্যয় হবে। ধর্ষণের স্বীকার হওয়া সত্ত্বেও নারীটিকে উল্টো নিপীড়নের স্বীকার হতে হল নিষ্ঠুরভাবে। আর দৈনিক পত্রিকার পাতায় ছাপা হয়ে ছড়িয়ে গেছে সে নিপীড়নের ছবিও। হয়তো সেখানে উপস্থিত থাকা অনেকে মোবাইলেও ধারণ করে ফেলেছে, তার অনুমতি বা আপত্তির কথা জানতে চাওয়া তো ছিল তাদের কাছে বাতুলতা।

মোটকথা এ ধর্ষিতা নারীটিকে ঘিরে এ নিপীড়নের ছবিটিই হলো আমাদের সমাজের চালচিত্র, সমাজের মুখ। ধর্ষিতা নারীকে পেটানোর ক্ষেত্রে স্থানীয় ব্যক্তিরা একটি সুচতুর কৌশল অবলম্বন করেছেন। তারা নারীকে পেটানোর জন্য বাধ্য করেছেন তার পরিবারের সদস্যদের। যাতে সহজে অন্য মানুষকে বোঝানো যায় এ নারীকে শাসন করছে তারই পরিবার। কথা হল একজন মানুষকে শারীরিকভাবে আক্রমণের অধিকার কারো নেই। তা স্বামী, পিতা বা যেই হোক না কেন।

ছবিটিতে দেখি ধর্ষিতা নারীর পেছনে লাঠি দিয়ে আঘাত করা হচ্ছে। একজন শাদা পাঞ্জাবী পরা বয়স্ক ব্যক্তি পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছেন, পাশে মাথায় সানগ্লাস পরা এক ব্যক্তি দাঁত বের করে হাসছেন, মূলত ছবিটিতে থাকা সব ব্যক্তিই হাসছেন। নিশ্চয় তখন কোন মজার কথা বলা হয়েছিল বা কটুক্তি, আরেকজন ব্যক্তি চেয়ার থেকে উঠছেন—তাকে অন্য এক হাত বাড়িয়ে কিছু বলছেন, আরেকজন লাল গেঞ্জি পরিহিত হোদকা পেটে হাসছেন, আরেকজন ঘরের আড়ার দড়ি ধরে ঝুলে ঝুলে ঘটনা দেখছেন। এ রকম একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনায় এতগুলো লোক কি করে এত ঠাণ্ডা মাথায় নিপীড়নের ঘটনাটি দেখতে পারেন ও হাস্যরস করতে পারেন ভাবি? আমাদের সমাজব্যবস্থা কি এতটাই পঁচে গেছে? শিক্ষিতের হার বেড়েছে, জনসচেতনতা বাড়েনি? মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে, কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়েনি?

মূলত বাংলাদেশে গ্রাম্য ছোটখাট বিচারের জন্য ফতোয়া/সালিশ প্রথা বিদ্যমান রয়েছে। তবে ফতোয়ার মাধ্যমে কাউকে শারীরিক শাস্তি দেওয়া যাবে না বলে আদালত রায় প্রদান করেছিল। কিন্তু ‘ফতোয়া’, ‘সালিশ’ এসব শব্দের দ্বারা এ ধরনের নারী নিপীড়নের ঘটনাগুলোকে বৈধতা দেয়া হয়। সেসব বিচারে গ্রামের ধর্মীয় ও স্থানীয় ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা ও তাদের চেলাচামুন্ডারা উপস্থিত থাকে ও অংশগ্রহণ করে বলে এসব ঘটনা নিয়ে পুলিশের কাছে বিচারের জন্য ভুক্তিভোগীরা যেতে পারে না। তার বাকী জীবন হয়ে যায় দুর্বিষহ। অপরাধ না করেও সে সামাজিকভাবে একঘরে হয়, বঞ্চনা-গঞ্চনার শিকার হয়। শুনতে হয় কটুক্তি, মেনে নিতে হয় অপবাদ ও মানসিক অত্যাচার। কখনো কখনো এসব শারীরিক অত্যাচার পরিবারের মাঝে ধারাবাহিক রূপ নেয়। অনেক নারী এসব সহ্য করতে না পেরেও আত্মহত্যাও করে বসে।

স্থানীয় থানা-পুলিশ সাংবাদিকদের বলেছে তারা কোন অভিযোগ পায়নি। কিন্তু আমরা সংগঠিত একটি অপরাধের ছবি দেখতে পাচ্ছি, যেখানে একজন ধর্ষিতা নারীকে শারীরিক শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, যা আইনত অপরাধ। সে নারীটি চুপ করে থাকলেও কি আমরা এভাবে চুপ করে থাকব? নারীদের নিয়ে সত্যি মাঠে কাজ করা মানবাধিকার কর্মীরা কি সে নারীর কাছে যাবে না? তার পাশে দাঁড়াবে না?

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s