রমেল চাকমা হত্যাকাণ্ডে সেনাবাহিনীকে রাষ্ট্র দায়মুক্তি দেবে, ইতিহাস দেবে না

bipul

।। ফাইল ফটো: বিপুল চাকমা।।

আদিবাসীদের সঙ্গে যে আচরণ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী করছে বছরের পর বছর ধরে তার সঙ্গে হানাদার পাকিস্তান সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালে সমতলের বাঙালীদের সঙ্গে যা করেছিল তার কোন পার্থক্য আছে কি? নেই। কাগজে-কলমে সেনাশাসন থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে এসেছে ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে, কিন্তু রাঙামাটি-বান্দরবান-খাগড়াছড়ি এ তিন জেলায় তার তেমন কোন প্রভাব পড়েনি। বরঞ্চ পাহাড়কে করা হয়েছে আরো বেশি সামরিক, সমরাস্ত্রে সুসজ্জিত, আরোপ করা হয়েছে নিত্যনতুন নিয়ন্ত্রণমূলক আইন, তৈরি হয়েছে নতুন নতুন সেনা ক্যাম্প, সেনা জোন। একের পর এক বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে পাহাড়ী ছাত্রনেতারা।

বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ এর নেতা ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী আংশিক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী রমেল চাকমাকে ৫ এপ্রিল মেজর তানভির-এর নেতৃত্বে একদল সেনাসদস্য তাকে টেনেহিঁচড়ে রাঙামাটির নানিয়ার চর ৭ই বেঙ্গল সেনাজোনে নিয়ে দিনভর তার উপর অমানুষিকভাবে শারীরিক নির্যাতন করে। সেদিন রাতে মৃতপ্রায় তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে দায়ভার থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করলে স্থানীয় থানাপুলিশ অস্বীকৃতি জানায়। উপজেলা সদর হাসপাতালও অস্বীকৃতি জানায়। পরে সরাসরি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। সেখানে রমেল চাকমা সেনা হেফাজতে থাকা অবস্থায় মারা যান।
তিনি ছিলেন আংশিক দৃষ্টি প্রতিবন্ধীও। ডানচোখে তিনি দেখতে পেতেন না। এ বছর ২ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এইচএসসি পরীক্ষার পরীক্ষার্থী ছিলেন তিনি। ৫ তারিখে যেদিন তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় বাজার থেকে সেদিন তার পরীক্ষা ছিল না।

অভিযোগ উঠেছে তার লাশটিকে তার বাড়িতে নিতে দেয়নি সেনা সদস্যরা। তারা লাশটি ‍নিজেদের হেফাজতে নিয়ে রেখেছে বলে জানা গেছে। গতকাল ২০ এপ্রিল বিকালে রমেল চাকমার প্রাণহীন শরীরটি রাত ৮টার দিকে বুড়িঘাট বাজারে পৌঁছানোর পর তার আত্মীয়রা তা গ্রহণ করে বাড়িতে নিয়ে যেতে ট্রলারে (ইঞ্জিনচালিত নৌকা) উঠলে একদল সেনাসদস্য লাশ ট্রলারসহ লাশটি তাদের হেফাজতে নিয়ে নেয়।

37220

।। ফাইল ফটো: রমেল চাকমা ।।

১৯৯৬ এ হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নেত্রী কল্পনা চাকমাকে তুলে নিয়েছিল সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা, তার লাশও পাওয়া যায়নি। বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি সেনাবাহিনীর সদস্যদের। পাহাড়ে আধিপত্য কায়েম রাখতে জমি দখল করে সেখানে বাঙালী সেটেলারদের ঢোকানো হয়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে পাকশাসকরা বলেছিল বাঙালী নারীদের ধর্ষণ করতে, যাতে তাদের গর্ভে আসা সন্তানেরা পাকিস্তানের কথা বলে। তার ধারাবাহিকতায় পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালী মুসলমান সেটেলার মানে যারা বেআইনিভাবে আদিবাসীদের ভূমি দখল করে অবস্থান নিয়েছে তারা আদিবাসী নারীদের ধর্ষণ, অপহরণ ও লাঞ্ছনা করে নিয়মিত। কল্পনা চাকমা বাংলাদেশের আদিবাসীদের ওপর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর করা জুলুমের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জ্বলন্ত উদাহরণ।

বাংলাদেশে মানবাধিকার কমিশন নামে একটি ঘুমন্ত সংগঠন আছে। যাদের কাজ হল মানবাধিকার বিষয়ক নানারকম অনুষ্ঠান করা। মানে তাদের কাজ হল ইভেন্ট করা। সমাজের মূলস্রোতে তাদের এমন কোন ভূমিকা বা কেসহিস্ট্রি কি আছে যে তারা বাংলাদেশে মানবাধিকার রক্ষায় সামান্যতম ভূমিকা রেখেছে? রাখেনি। তবুও রমেল চাকমার পিতা কান্তি চাকমা বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনকে একটি চিঠি লিখেছিলেন তার সন্তান ফেরত পাবার আশায়, যখন রমেল হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলেন।

গত ২৩ অক্টোবর পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের আরেক নেতা, কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বিপুল চাকমাকে গ্র্রেফতার করা হয় যখন তিনি তার ক্যান্সারে আক্রান্ত অসুস্থ মাকে নিয়ে চট্টগ্রাম যাচ্ছিলেন। এ ঘটনায় তার মা আরো অসুস্থ হয়ে সেদিন রাতেই মারা যান। তার মায়ের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে ৭ ঘন্টার প্যারোলে তাকে নিয়ে আসা হয় হাতে হাতকড়া পরানো অবস্থায়, তার সাথে লম্বা একটা দড়ির এক প্রান্তে পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকে। বিপুল ছিলেন পায়ে লোহার বেড়ি ও গায়ে বুলেটপ্রফ জ্যাকেট পরিহিত অবস্থায়। সঙ্গে তিনগাড়ি পুলিশ, দুই গাড়ি সীমান্তরক্ষী সশস্ত্রভাবে তার বাড়ির আশেপাশে অবস্থান নেয়। একই সাথে খাগড়াছড়ির সমস্ত এলাকায় সেনাবাহিনী সশস্ত্র টহল দিতে শুরু করে।

পাহাড়ের রাজনৈতিক সংগ্রামে এমন অসংখ্য হরর গল্প বলা যায়। গল্প নয় সত্যি, ১৩ টি জাতিসত্তার মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী একদিন লিপিবদ্ধে হবে মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রের মতো খণ্ডে খণ্ডে। সেসব গ্রন্থে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও হানাদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চরিত্রে অভিনয় করবে। মুক্তিযুদ্ধের বছরে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে ডিসেম্বর যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গঠিত হয়েছিল দেশকে শত্রুমুক্ত করে, সে সেনাবাহিনীর জন্য এর থেকে আর করুণ চরিত্র আর কি হতে পারে! এসব ঘটনায় রাষ্ট্র দায়মুক্তি দেবে, কিন্তু ইতিহাস কখনো দায়মুক্তি দেবে না।

 

 

Supporting Link: http://www.dailycht.com/news/details/bangladesh/37220

Advertisements

নয়ন খাঁ মঙ্গল শোভাযাত্রায় যে পাঞ্জাবিটি পরবে

1-18

মাত্র কয়েকদিন পরেই পহেলা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষ। নয়ন হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছায় শপিং কমপ্লেক্সের সামনে। একটু থামে, পকেটে হাত দিয়ে দেখে টাকা ঠিক আছে তো! টাকা হারিয়ে ফেলার বাতিক আছে নয়নের। নাহ! টাকা ঠিকই আছে। এক হাজার পাঁচশত টাকা মানিব্যাগে ঠিকই আছে। সারা বছর টাকা জমায় নয়ন এই বিশেষ দিনটির জন্য। পুরাতন বছরটিকে পেছনে ফেলে নতুন বছরকে বরণ করে নেবার প্রস্তুতি নেয় নয়ন। প্রতি বছর নববর্ষে একটি নতুন জামা তার চাই। দোকান ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে নয়ন। এবারে ঢোল আঁকা একটি পাঞ্জাবি তার পছন্দ হয়েছে। বারোশত টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে খুশিমনে বাড়ির পথে রওয়ানা দেয় সে। পহেলা বৈশাখ দিনটি কেমনে করে কাটাবে এ নিয়ে বেশ ক’দিন ধরেই পরিকল্পনা আঁটছিল মনে মনে। নতুন পাঞ্জাবির ব্যাগ হাতে এসে দাঁড়ায় দরজায়, কলিংবেল বাজাতেই বড় চাচা দরজা খুলে দেন। ঘরের ভেতরে ঢুকে প্যাকেট খুলে পাঞ্জাবিটা দেখতে থাকে আর মনে মনে পুলকিত বোধ করে। রাতে খাবার টেবিলে বসে বড় চাচা জিজ্ঞাসা করেন,

—‘কী কিনে আনলে?’
—‘পাঞ্জাবি।’
—‘হঠাৎ পাঞ্জাবি কিনলে?’
—‘পহেলা বৈশাখে পাঞ্জাবি পরে মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করবো’, বলল নয়ন।
—‘ওসব হিন্দুয়ানি কালচার এ বাড়িতে চলবে না। কে তোমাকে অনুমতি দিয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রায় যাওয়ার?’ খুব জোরে চিৎকার করে এ কথাগুলো বলছিলেন বড় চাচা। মুহূর্তেই খাবার টেবিলের পরিবেশ নিঃশ্চুপ গম্ভীর হয়ে যায়। চাচা এবার কণ্ঠস্বর নামিয়ে নিয়ে শান্ত গলায় বললেন, ‘আগে খাওয়া শেষ করো, তারপরে সবাই বৈঠকখানায় এসো, আজ তোমাদের সকলের সাথে কিছু কথা বলবো।’

রাত প্রায় এগারটা। সবাই বৈঠকখানায়। নয়ন সেখানে অনুপস্থিত। তাকে ডেকে পাঠানো হলো। বাড়ির সবাই এশার নামাজ পড়ে রাতের খাবার একসাথে বসে খায়, এটা খাঁ বাড়ির নিয়ম, রাত দশটার মধ্যে বিছানায় ও ফজরের ওয়াক্তে ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়া। নয়ন এসে বৈঠকখানায় ঢুকতে বড় চাচা তাকে ডেকে কাছে বসান। এর পরে তিনি বলতে শুরু করেন—

‘আমরা মুসলমান, আমাদের পহেলা বৈশাখ পালন করা হারাম। ইসলামের দৃষ্টিতে নওরোজ বা যে কোন ধরনের নববর্ষ পালন করা হারাম ও বিদ্য়াত। হজরত ইমাম আবু হাফস কবীর রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, নওরোজ বা নববর্ষ উপলক্ষে যদি কেউ একটা ডিমও দান করে তার ৫০ বৎসরের আমল থাকলে তা বরবাদ হয়ে যাবে। অর্থাৎ নওরোজ বা নববর্ষ পালনের কারণে তার জিন্দেগীর সমস্ত আমল বরবাদ হয়ে যাবে। যে ব্যক্তি নওরোজের দিন এমন কিছু খরিদ করল যা সে পূর্বে খরিদ করত না, এর মাধ্যমে সে যদি ঐ দিনকে সম্মান করতে চায় তাহলে সে কাফের হয়ে যাবে। হাম্বলি মাযহাবের ফিকাহর গ্রন্থ ‘আল-ইকনা’ তে বলা হয়েছে–“কাফিরদের উৎসবে যোগদান করা, সেই দিন উপলক্ষে বেচা-বিক্রি করা ও উপহার বিনিময় করা হারাম”। বর্তমানে পঞ্জিকা বা ক্যালেন্ডারে মোট ৩টি সন গণনা পদ্ধতি চালু আছে। হিজরী বা আরবী সন, বাংলা বা ফসলী সন ও ইংরেজি বা গ্রেগোরিয়ান সনটি। মুসলমানদের জন্য অবশ্যই পালনীয় হিজরী বা আরবী সন। বৈশাখ শব্দটি এসেছে বিশাখা নক্ষত্রের নাম অনুসারে পয়লা বৈশাখ বা পহেলা বৈশাখ (বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস বৈশাখের ১ তারিখ) বাংলা সনের প্রথম দিন, তথা বাংলা নববর্ষ। মুসলমানের প্রিয় নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতের পর মদীনা শরীফ গিয়ে ঐ এলাকাবাসীর দুটি উৎসব বন্ধ করেছিলেন। একটি হচ্ছে, বছরের প্রথম দিন উদযাপন বা নওরোজ; অন্যটির নাম ছিলো ‘মিহিরজান’। এ উৎসবের দু’টির বিপরীতে চালু হয় মুসলমানদের দুই ঈদ। (তাফসিরসমূহ দেখতে পারেন) মূলত: নওরোজ বা বছরের প্রথম দিন পালন করার রীতি ইসলামে নেই, এটা পার্সী মজুসীদের (অগ্নিউপাসক) অনুকরণ। এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে আছে: “যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণ করে সে তাদের দলভুক্ত।” তাই যে কোন নওরোজ সেটা থার্টি ফাস্ট নাইট হোক, পহেলা নববর্ষ হোক কিংবা পহেলা মুহররম হোক, বিজাতীয় রীতি হিসেবে প্রতেকটি ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সকল ইসলাম বিরোধী কাজ থেকে মুসলমানদের বিরত রাখা অর্থাৎ মুসলমানদেরকে ইসলাম পালনে উৎসাহিত করে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা প্রত্যেক মুসলমানের নৈতিক কর্তব্য ও প্রধান দায়িত্ব।’

বড় চাচার বক্তব্য শেষ হলে নয়ন নিজের রুমে চলে আসে। বিছানায় শুয়ে থাকে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে। ওর চোখ জলে ঝাপসা হয়ে ওঠে। সে বুঝতে পারে না, ইসলাম ধর্ম আর তার বাংলা সংস্কৃতি পালনের বিরোধটা কোথায়? বালিশে মাথা রেখে নয়ন ভাবতে থাকে আর দু’চোখ গড়িয়ে পড়া জলে ভিজে যায় বালিশ। রাগে ফুঁসতে থাকে মনে মনে, শব্দ করে মুখ ফুটে কিছুই প্রকাশ করতে পারে না। বুকের ভেতরে কেমন জানি অস্থির লাগছে, অসহায়ের মত সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আনমনে একা একাই কথা বলতে শুরু করে।
—বাংলা নববর্ষ পালন যদি হারাম বা বিদআত হয় তবে বাংলা ভাষায় কথা বলা কেন হারাম নয়!
—বিশাখা নক্ষত্রের নামে বৈশাখ মাসের নাম রাখা হয়েছে। বিশাখা নক্ষত্রও তো সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি। সৃষ্টিকর্তা যদি এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করে তবে তার সৃষ্টিকে সে নিজেই কেন অপছন্দ করে!
—বাঘ, মাছ, ময়ূর, হরিণ, হাতি–বনের সব পশুই তো সৃষ্টিকর্তারই সৃষ্টি তবে ওগুলোর প্রতিকৃতি বানানো নিষেধ কেন?

—গান বাজনা নিষেধ কেন? গান শুনলে বা গাইলে কার কি ক্ষতি হয়! ক্ষতি না হলে নিষেধ কেন?
—সৃষ্টিকর্তা নিজের তো শিল্পের কারিগর; তবে তার সৃষ্টি আশরাফুল মাখলুকাতকে শিল্পী হতে কেন নিষেধ করেছে?
—বাঙালি সংস্কৃতি নববর্ষে পালন করে যদি মানুষ আনন্দ পায় তাহলে সৃষ্টিকর্তার বা অন্য কোন জীব-জন্তু-জানোয়ারের ক্ষতি হয়? অথবা পৃথিবীর?
—মুসলমানের যদি কোরান হাদীসের আলোকে ইসলামিক রীতিনীতি আইন কানুন মেনেই যদি বেঁচে থাকতে হয় তবে আমরা মুসলমানেরা বিভিন্ন ভাষায় কথা বলি কেন? কেন আমরা এদেশের সংস্কৃতি অনুযায়ী ভাত, মাছ, গোশত, তরকারী খাই?
—যদি আমরা আরবী ভাষায় নামাজ পড়ি তবে তো বাংলা ভাষা ব্যবহার করা বিদআত!

নয়ন আর ভাবতে পারছে না, মাথা ভারী হয়ে আসছে। এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে নয়ন। পরেরদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে পাঞ্জাবিটা রেখে আসে বন্ধুর বাড়িতে। এখান থেকেই বন্ধুর সাথেই সে মঙ্গল শোভাযাত্রায় যাবে। বাড়ির কাউকে সে জানতে দেবে না। নয়নের চোখে স্পষ্ট ভেসে ওঠে অনেক অনেক মানুষের সাথে মিছিলে সেও একজন বাঙালি। নতুন পাঞ্জাবির ঘ্রাণ নাকে লাগে। দিন বদলের হাওয়ায় নববর্ষের ভোরে নয়নেরা জন্ম দেবে নতুন নয়নের।

বৈশাখী জ্বালা

boishak-1.jpg

`দাদা পায়ে পড়ি রে

মেলা থেকে বউ এনে দে’

জনপ্রিয়তা পেয়েছিল গানটা। আমার ছেলেবেলায় পহেলা বৈশাখে রাস্তায় বেরুলেই এই গানটি কানে ভেসে আসতো। তখন ভাবতাম মেলায় বউ পাওয়া যায়। আমারও একটা বউ চাই। খুব আগ্রহ আর উৎসাহ নিয়ে মেলায় যেতাম। আর মাটির ঢেলা দিয়ে তৈরি মাটির বউ কিনে নিয়ে খুশিমনে বাড়ি ফিরতাম। একটু বড় হওয়ার পরে সকালবেলা বের হয়ে যেতাম মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করতে। হরেক রকম মুখোশ পরে নগরীর এক প্রান্ত থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয়ে অন্য প্রান্তে গিয়ে শেষ হত। সকল মানুষের মঙ্গল আর সমৃদ্ধি কামনা করে সমাজের সব শ্রেণীর মানুষ বর্ষবরণের এ মঙ্গল শোভাযাত্রার অংশগ্রহণ করে। এখন বাংলা বর্ষবরণ উৎসবে মঙ্গল শোভাযাত্রা অন্যতম মাত্রা যোগ করেছে এবং নবতর সার্বজনীন সংস্কৃতি হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। গৌরবের কথা, ২০১৬ সালের ৩০শে নভেম্বর বাংলাদেশের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে জাতিসংঘের ইউনেস্কো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান দিয়েছে।

‘মুসলমানের দেশে মঙ্গল শোভাযাত্রা চলবে না’–ইসলামী ঐতিহ্য সংরক্ষণ কমিটির বিক্ষোভ শিরোনামে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এ খবর ছাপা হয়েছে ক’দিন আগে। শুধুমাত্র এ বছরই নয়, কয়েক বছর ধরেই বাঙালির সার্বজনীন প্রাণের বর্ষবরণ উৎসব পহেলা বৈশাখকে অপসংস্কৃতি ও হিন্দুয়ানি আখ্যায়িত করে প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছে দেশের ভেতরে একটি দুষ্ট গোষ্ঠী। বাংলা সংস্কৃতি ধ্বংস করে দিয়ে ধর্মীয় সংস্কৃতিকে সার্বজনীন করার ষড়যন্ত্রে তারা লিপ্ত। আমাদের দেশে অনেক ধর্মের মানুষ বাস করলেও আমরা বিশ্বাস করি যে, আমাদের সকলেই বাঙালি, আমাদের মাতৃভাষা বাংলা এবং আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি সার্বজনীন; আমরা বাংলাদেশী। যারা ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান পহেলা বৈশাখ পালনকে ঠিক নয় বা পাপ বলে মনে করে, মঙ্গল শোভাযাত্রা বন্ধ করতে তারা এত উদগ্রীব কেন? তারা বলেছে মঙ্গল শোভাযাত্রায় যেসব পশুপাখির প্রতিকৃতি ব্যবহার করা হচ্ছে ওগুলো নাকি আমাদের দেশের পশুপাখী নয়, ওগুলো হিন্দু দেব-দেবীদের বাহন। পশুপাখিদেরও ধর্ম আছে আগে কখনো শুনিনি, এ যুগে এমন কথা শুধু স্বাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন লোকেও বলে না!

কেউ তো আর কাউকে বাংলা সংস্কৃতি বা উৎসব পালন করতে বাধ্য করছে না। মঙ্গল শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত পেঁচা, ময়ূর, বাঘ, দোয়েল, হরিণ, নৌকা ইত্যাদি প্রতিকৃতিমূলক শিল্পকর্ম দেখে যদি কারো জাত বা ধর্ম চলে যায় তবে তারা বাঙালি ও বাংলাদেশী পরিচয় প্রকাশের পূর্বে একটু ভেবে নিক যে তাদের আত্মপরিচয় কি! ধর্ম নয়, আমরা বাংলা মায়ের সন্তানেরা আমাদের বাঙালী পরিচয় নিয়ে গর্বিত।

** ছবি: চট্টগ্রামের চারুকলা ইনস্টিটিউটে বৈশাখী দেয়ালচিত্রে রাতের অন্ধকারে পোড়া মবিল লেপটে দেয় মৌলবাদীরা।

 

অভিজিৎ রায়ের খুনীকে

তাকে মেরেছো ধর্মের অন্ধকারে, ছুরিকাঘাতে,
সে এখন একা নয় বহু; সমুদ্রের ধারে যাও,
দেখো বিপুল জলরাশি মাথা নত করে তার কাছে,
তার কোনো অভিযোগ নেই, সে এখন স্বাধীন,
সে এখন একহাতে কণ্ঠ চেপে ধরে, অহরহ
অন্যহাতে তোমার দিকে হাওয়ায় বাড়ায় পানপাত্র।
বিস্তীর্ণ সমুদ্রের আকাশে ওঠে অভিজিৎ তারা,
তুমি তাকে দেখো, আপন আলোয় বিভা ধরে সে।
ধর্মের নামে আমাকেও মারো, মেরে কেবলি রক্তাক্ত করো,
আমার জন্য টাঙাও রক্তরাত্রি আর মেখে দাও রক্তভাত,
এমন অন্ধ সমীকরণ কি মানা চলে?
শুকিয়ে গেছে ঝর্ণা তোমার এমন বিচারে;
ফুল ঝরে যায় ভোরবেলা, কাপালিকের সামনে উন্নত মস্তকে
এসে দাঁড়ায় আমাদের পাশের বাড়ির মেয়ে কপালকুণ্ডলা!

(২০১৫)

ধর্মের ত্রিশূলে কনডম: ভয়ের উৎসে শ্রীজাতের আঘাত

56437851.cms.jpg

কবি শ্রীজাত আবারও ভয়ের উৎসে নাটকীয় আঘাত হানলেন। বুধবার কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯৫-এ ধারায় ও সাইবার ক্রাইমের ৬৭ ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে শিলিগুড়ি আদালতে। এর মধ্যে ২৯৫-এ ধারাটি জামিন অযোগ্য।

যখন বাংলাদেশে মৌলবাদীদের চাপাতির আঘাতে ব্লগার-এক্টিভিস্ট-প্রকাশকদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে ফেসবুকে ‘অন্ধকার লেখাগুচ্ছ’ লিখেছিলেন তখন অবাক হয়েছি। কেননা এ ঝুঁকি মিডিয়া প্রতিষ্ঠিত কবিরা নেয় না। কিন্তু শ্রীজাত তা নিয়েছিলেন। তিনি চুপ থাকতে পারেননি। সে কবিতাগুচ্ছ পরে বই আকারে প্রকাশিত হয়, এমনকি সে কবিতা নিয়ে ‘শঙ্খমালা’ নামের নাটকের দলটিও একটি প্রযোজনা করেছিল। হ্যাঁ, আমার ভয় এবার সত্যি হল। শ্রীজাতকে নিয়ে সেই নোংরা লোকেরা মেতে উঠেছে তাকে তুচ্ছ প্রমাণ করার জন্য। একমাত্র বাঙালিদেরই সাজে যে অমুক কবি নয়, অমুক লিখতে পারে না—এমন কথা বলার। পৃথিবীর আর কোন দেশের লোকেদের এমন কথা কাউকে বলতে দেখি না। জীবনানন্দ বলেছিলেন, ‘কবিতা নানারকম।’ আমরা জানি আজ তার শ্রেষ্ঠ সময়। কিন্তু আমরা কি জীবনানন্দকে তার সময়ের একমাত্র কবি বলে মানব? আমি বরিশালের মানুষ হয়েও তা মানব না। শ্রীজাত মাঝে মাঝে ভাল কবিতা লেখেন, কিন্তু তাকে ফরমায়েশি কবিতাও লিখতে হয়, যেসব কবিতা পাঠক পড়তে চায়। যেমন: পহেলা বৈশাখের কবিতা, মে দিবসের কবিতা, অন্য কবির জন্মদিনের কবিতা, অন্য কারো মৃত্যুদিনের কবিতা, এবং রাজনৈতিক সমর্থনের কবিতা। বিমূর্ত কবিতা লিখে অসৃষ্টিশীল মানুষের চিন্তায় অভিঘাত দেয়া সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষ একটি শব্দ, একটি বাক্য, একটি চিহ্ন, প্রতীক দিয়ে আলোড়িত হয় মাত্র। তাই একাডেমিশিয়ানদের জন্য ভালো কবিতার যেমন দরকার আছে, তেমনি সাধারণ মানুষদের জন্য ফাংশনাল কবিতারও দরকার আছে। যেমন: শ্লোগান। বাংলাদেশে আমরা ৯০ দশকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের সময়ে বুকেপিঠে নূর হোসেনের (পুলিশের গুলিতে নিহত) লেখা শ্লোগানের শক্তি দেখেছি। এর মাঝে কবিতার রাজনৈতিক শক্তি নামে একটি গদ্য লিখেছি, কখনো হয়তো আপনাদের পড়তে দেব। সেখানে আমি দেখিয়েছি বাংলাদেশে আমার প্রজন্মে প্রগতিশীলতার বিস্তারের পেছনে মাত্র কয়েকটি অনুষঙ্গ নিয়ামক ছিল, যেমন কিছু গান-কবিতা-মঞ্চনাটক। আর একজন লেখক নানাভাবে লিখতে না পারেন তার যদি সে সামর্থ্য না থাকে সে আবার লেখক হল কিসে? আসলে কবিতা-অকবিতা বলে কিছু নেই, সমস্ত শব্দগুচ্ছ একজন মানুষের মনবিশ্বের প্রতিবিম্বপ্রদানকারী। ধর্মীয় উগ্রবাদী মন্তব্যকারী উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর ফেসবুক পেজে একটি কবিতা পোস্ট করেন শ্রীজাত; সে কবিতা নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে তা নিচে দিলাম—

‘সময়ে ওষুধ, নইলে বেড়ে যায় সবরকম রোগই
ভিখ পেতে পেতে তুমি রাজা হয়ে ওঠো, গেঁয়ো যোগী।

উঠেই নির্দেশ দাও, ধর্মের তলব দিকে দিকে
মৃগয়ায় খুঁজে ফেরো অন্য কোনও ধর্মের নারীকে।

যে–হরিণ মৃত, তারও মাংসে তুমি চাও অধিকার
এমন রাজত্বে মৃত্যু সহজে তো হবে না তোমার।

বাতাসে হাপর নামে, দেশ জুড়ে অধর্মের ছাই…
প্রতি নির্বাচনে আমরা শতাব্দীপিছনে ফিরে যাই।

যেখানে পুরুষধর্ম ধর্ম-পুরুষের অন্য নাম
আর আমি নারীর মৃত্যু পার করেও শিকার হলাম।

আমাকে ধর্ষণ করবে যদ্দিন কবর থেকে তুলে—
কন্ডোম পরানো থাকবে, তোমার ওই ধর্মের ত্রিশূলে!’

(অভিশাপ/শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়)

ব্যক্তিমানুষ মরে যায়, হারিয়ে যায় তার সমস্ত কাজকর্ম; শুধু থেকে যায় দুধের উপর সরের মতো তার লেখাটুকু। সে জায়গায় শ্রীজাতের এ ‘অন্ধকার লেখাগুচ্ছ’ থাকবে, থাকবে সমস্ত ধর্মচিহ্নে (ত্রিশূলে) তার পরানো কনডম, যার অর্থ আমার কাছে উগ্র ধর্মবাদের যে অহরহ সন্তানসম্ভবা দশা, একের পর এক উন্মাদ ধর্মশিশুর জন্ম নেয়া তার রোধ। সন্ত্রাসের বাতাবরণের মাঝে শ্রীজাত নিরব থাকেননি, জামিন অযোগ্য ধারার মামলা হয়েছে। বাংলাদেশে, ভারতে, পাকিস্তানে একের পর লেখক খুনের ঘটনা ঘটছে। জানি না হয়তো আমার শঙ্কা একদিন সত্যি হবে, ধর্মবাদের প্রপাগান্ডা মেশিন যেভাবে বাংলাদেশ, ভারতে, পাকিস্তানে শক্তিশালী হয়ে উঠছে এসব ধর্মউন্মাদ লোক যাদেরকে তিনি নির্বাচনের সময়ে সমর্থন দিয়ে লেখেননি ও ভাগাড় ঘাঁটা পাতি বুদ্ধিজীবীদের জন্য শ্রীজাতকেও একদিন দেশত্যাগের যন্ত্রণা গ্রহণ করতে হবে। উগ্র ধর্মবাদ নিপাত যাক, বাংলার মানুষ মুক্তি পাক। বাক স্বাধীনতা সরব থাক।

স্বাধীনতাবিরোধী বইয়ের গন্ধ শোঁকা কমিটি ও কিছু কথা

c014e5263f65c35f9c529e51a80da0a5-58c175d477834
কবি শামসুর রাহমানের মতো কোন সাহসী কবি এখন নেই, যিনি লিখতে পারতেন ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’ এর মতো নতুন কোন পঙক্তি।
আমি কোন প্রকার বই নিষিদ্ধের সমর্থন করি না। তাহলে তো আগে ধর্মগ্রন্থগুলোকে নিষিদ্ধ করতে হয়। কিছুদিন আগে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদ অবশ্য নিষিদ্ধ করেননি, তিনি ইসলামী আলেম-ওলামাদের সাহায্য নিয়ে কোরানের কিছু উগ্র আয়াত বিয়োজন করে কোরানের নতুন ও গ্রহণযোগ্য সংস্করণ প্রকাশ করেছেন। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আজকের ধর্মগ্রন্থগুলো নানা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংযোজন ও বিয়োজনের মধ্য থেকে আজকের অবস্থায় এসেছে। থাক সেসব কথা। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আসি।
মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাজাপ্রাপ্তদের রচিত সব ধরনের প্রকাশনা নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা করছে সরকার। এ বিষয়টি আমি কোনভাবে সমর্থন করি না। এসব বই নাকি নিষিদ্ধ করা হবে সমাজে শান্তিভঙ্গ, ধর্ম অবমাননা, মুক্তিযুদ্ধ ও দেশের ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগে এবং সেসব বই প্রকাশনা ও বাজারজাত বন্ধ করা হবে। সরকারের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নাকি জামায়াত-শিবিরের পাঠ্যতালিকা, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের রচিত বইও নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বাজার থেকে তুলে নিতে হবে অভিযুক্ত গ্রন্থগুলো। এর পক্ষে সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতামত হল: জামায়াত-শিবিরসহ উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো স্বাধীনতাবিরোধীদের লেখা পড়েই মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়। এতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাদের ভুল ও বিভ্রান্তিমূলক রচনা পড়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এসব বিবেচনা করে স্বাধীনতাবিরোধীদের লেখা নিষিদ্ধ করবে সরকার।
সরকার আসলে গোড়ায় হাত দিচ্ছে না। যেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের মতো আইন করা দরকার, জামাতের মতো উগ্রপন্থী দলগুলোকে রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করা উচিত, হেফাজতকে রাস্তা থেকে হটানো উচিত, যেখানে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে আস্তে আস্তে ছাত্রদের সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় একত্রীভূত করার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেয়া উচিত, যেখানে জামাতের ফান্ডিং বন্ধ করার জন্য সরকারের ইসলামী ব্যাংক ও বীমাগুলোর প্রতি নজরদারি বাড়ানো উচিত, সেখানে সরকার প্রকাশনা জগতের ওপর পুরোপুরি সেন্সরশিপ আরোপের চেষ্টা করছে।
এ ধরনের প্রকাশনা ব্যান হলে কাগুজে প্রকাশনা থেকে পিডিএফ এর মাধ্যমে ইন্টারনেটেও ছড়িয়ে পড়বে। আজ ইন্টারনেটের যুগে এভাবে কি বইয়ের বাজারজাত বন্ধ করা সম্ভব?
বাংলাদেশ ৯০ এর দশকে গণতন্ত্রে পুনরুত্থানের পরে গত প্রায় এক দশকে বর্তমান সরকারের আমলে সবচে বেশি মাত্রায় সরকারি সেন্সরশিপের স্বীকার হয়েছে। বই-সিনেমা-কার্টুন নিষিদ্ধ সহ ইন্টারনেটের বাক স্বাধীনতা হরণকারী ও সেলফ সেন্সরশিপ আরোপকারী কালো আইন আইসিটির ৫৭ ধারা তৈরি করে তার শিকার করা হয়েছে মানুষকে, ব্লগার-প্রকাশককে কারাবন্দী করা হয়েছে; গত ২২ আগস্ট সম্প্রচার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে অপপ্রচার চালালে বা তাতে মদদ দিলে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় শাস্তির বিধান রেখে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৬’-এর খসড়ার অনুমোদনও দেয় মন্ত্রিসভা। গেলবার বাংলা একাডেমি গ্রন্থমেলায় পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয় তথাকথিত ধর্মবিরোধী উপাদান সম্বলিত বইয়ের খোঁজে। ধারণা করা হচ্ছে নতুন প্রস্তাবিত এ খসড়া আইন হিসেবে বাস্তবায়িত হলে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী বইয়ের খোঁজে কাজ করবে যৌথভাবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো, বইয়ের গ্রন্থ শুঁকবে সরকারি বুদ্ধিজীবী-লেখকরা, তারা বইয়ের গন্ধ শোঁকা কমিটির সদস্য হিসেবে নির্দেশ জারি করবে প্রশাসনের প্রতি সংশ্লিষ্ট গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করতে, প্রকাশনা সংস্থা বন্ধ করে দেয়া হবে ও লেখককে ধরে আনা হবে কোমরে রশি বেঁধে। হয়তো ‘বইয়ের গন্ধ শোঁকা কমিটি’র প্রধান হবেন বাংলা একাডেমির বর্তমান মহাপরিচালক; তিনি আইন লঙ্ঘন করে মেয়াদ বাড়িয়ে মহাপরিচালক আছেন। মুক্তচিন্তা রোধে তার ভূয়সী ভূমিকা প্রশংসিত সরকারী মহলে। তার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবার আগে হয়তো তার জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র খোলা হচ্ছে। ‘বইয়ের গন্ধ শোঁকা কমিটি’ হতে পারে তার পরবর্তী কর্মস্থল!
অথচ যাদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে স্বাধীনতাবিরোধিতার অভিযোগ ছিল এমন কোন ব্যক্তি এখনও ক্ষমতাসীন সরকারের বন্ধু হিসেবে আছেন, একাধিক ব্যক্তি পেয়ে গেছেন রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন পুরুস্কার যেমন শর্ষিনা পীরের স্বাধীনতা পদক। সে সব প্রত্যাহারে সরকারের কোন উদ্যোগ নেই। উদ্যোগ নেই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে সীমাহীন দুর্নীতি বন্ধের।
হেফাজতের দাবী অনুযায়ী পাঠ্যপুস্তক থেকে গল্প-কবিতা বাদ দিয়ে পাঠ্যপুস্তককে সাম্প্রদায়িক করা হয়েছে। ‘উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ!’
আমি শুধু ভাবি, স্বাধীনতার দলিল নামের বিশাল বিশাল খন্ডগুলো, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অসংখ্য বইগুলো কি গুটিকয়েক স্বাধীনতাবিরোধী বইয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে পারছে না? মানুষের মেধা কতোটা নিম্নদিকে ধাবিত হলে রাজাকারদের লেখা বই বিক্রি হয়, নতুন সংস্করণ বের হয়, ছড়িয়ে পড়ে ঘরে ঘরে বিদ্যুতগতিতে, সমাজকে কলুষিত করে?

লিঙ্ক: http://www.banglatribune.com/national/news/187491/%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%B7%E0%A6%BF%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7-%E0%A6%B9%E0%A6%9A%E0%A7%8D%E0%A6%9B%E0%A7%87-%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%88%E0%A6%A6%E0%A7%80%E0%A6%B8%E0%A6%B9-%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A7%E0%A7%80%E0%A6%A8%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A7%8B%E0%A6%A7%E0%A7%80%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%96%E0%A6%BE

আল্লামা শফিদের সঠিক পথে আসার আহ্বান নাস্তিকদের

সেক্যুলার খেলাফত পত্রিকা # নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধিঃ ০৯:০৮, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০১৭

c7aecacba6f9db5c3cca721be2bfbde3-587a6b6ce82aa

বাংলাদেশে আল্লামা শফিদের অনুসারীরা নানা ধরনের বিতর্কিত কাজ করছে। তাদেরকে সঠিক পথে আসার আহ্বান জানিয়েছেন হেফাজতে নাস্তিক্যবাদের আমীর বরিশালের কৃষকজাদা স্বশিক্ষিত দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর।
তিনি বলেছেন, ‘হে হেফাজতের দল তোমরা বলো, তোমাদের পরিকল্পিতভাবে বানানো হয়েছে। সবকিছু নাকি কোন এক সূক্ষ ইশারায় হয়েছে। কিন্তু তোমরা তো আসল কথা বোঝ না। তোমাদের সৃষ্টিকর্তা বলে আসলে কেউ নাই। তোমরা নাস্তিকতা বোঝ না, অথচ আল্লাহর নাম দিয়ে ট্যাকাটুকা গ্রহণ করছো, তার নাম ভাঙিয়ে বেঁচে আছো। তাই সঠিক পথে আসো।’
শুক্রবার রাতে নারায়ণগঞ্জ শহরের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে বাংলাদেশ নাস্তিক শিক্ষা বোর্ড (নাপাক) নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার উদ্যোগে ৩০৩ জনকে উপবৃত্তি প্রদান ও কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নাস্তিক্যবাদের আলোকে জীবন পরিচালনা করতে আহ্বান জানিয়ে মাতুব্বর বলেন, ‘ঈমান আকিদা ঠিক রাখতে হলে অবশ্যই যুক্তি মোতাবেক জীবন পরিচালিত করতে হবে।’
নাপাক জেলা কমিটির সভাপতি হুমায়ূন আজাদের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন নাপাকের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব তসলিমা নাসরিন, ‘নারী তুমি মানুষ ছিলে কবে’ পুস্তকের রচয়িতা (২০০০ সালে জঙ্গীদের হাতে নিহত) মনির হোসাইন সাগর, ‘ভাঙা মঠ’ গ্রন্থের রচয়িতা সালাম আজাদ (ভারতে নির্বাসিত), মুক্তমনা নাস্তাকিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল,ইস্টিশন ব্লগের প্রধান কর্মাধ্যক্ষ প্রমুখ।

(ইহা একটি জাল সংবাদ। জনস্বার্থে প্রচারিত। মূল সংবাদটি অনলাইন পত্রিকা বাংলা ট্রিবিউনের ১৮ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত)